প্রবাদ আছে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। মহৎ কিছু অর্জন করতে হলে ইচ্ছাশক্তিটাকে কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু শক্তি কাজে লাগাতে গেলে নানা ধরনের বাধা বিপত্তি আসতেই পারে। তাতে ভয় পেয়ে ইচ্ছাশক্তি অনুশীলনে বিরত থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। নির্ভীক থেকে এগিয়ে যেতে হবে লক্ষ্যের দিকে। যেমন, পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সাহসী নেতৃত্বের গুণে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু উন্নয়নের স্বর্ণদুয়ার উন্মোচন করেছে। এ সেতুতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যোগাযোগব্যবস্হার আমূল পরিবর্তন হবে। দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এ সেতু। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। বাঙালি জাতিকে কেউ পিছিয়ে রাখতে পারবে না।’
মোট কথা, বাংলাদেশের পুনর্জাগরণ ঘটেছে পদ্মা সেতুর সাফল্যে। এই পুনর্জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ভাব ভাবনা প্রবেশ করবে বাঙালির মননে। নতুন যৌবন শক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে উঠবে গোটা জাতি। এক শ্রেণির মানুষ আছে—‘খাওদাও মজা লোটো’—এই ভোগবাদী দর্শনে বিশ্বাসী। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এ দর্শনের বিপরীতে সেবা ও ত্যাগের দর্শন উপস্থাপন করেছেন। ভোগবাদী দর্শনভিত্তিক জীবনযাত্রা বাঙালি জাতি আর চায় না। আমরা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে সবকিছুকে উপভোগ করব। ত্যাগের মাধ্যমে যে অর্জন তা সবার জন্য সাফল্যের দুয়ার খুলে দেয়। উল্লেখ্য, ত্যাগী মনোভাবের প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ‘হিপি’ আন্দোলনে, বিশেষত আমেরিকায়, পরে ফ্রান্সে। এই আন্দোলনের সময় কোনো ছেলে বা মেয়ে বড়লোকের ঘরে জন্মিলেও সেই পরিবারের সঙ্গে নিজেকে অঙ্গীভূত করতে চাইত না। তারা পড়তে পছন্দ করত সহজ, সাদাসিধে জামাকাপড় যা ত্যাগের চিহ্ন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সব সময় সেবা, ত্যাগের মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার অণুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন এ জাতিকে।
প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় আমরা ইংরেজ শাসনের অধীনে ছিলাম। ইংরেজদের হাত থেকে মুক্তির জন্য সৃজনমুখী আন্দোলন গড়ে ওঠে এই উপমহাদেশে। সৃজনমুখী আন্দোলনকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন মহান চিন্তাবিদ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে। ঊনবিংশ শতকে এ উপমহাদেশে জন্মেছিলেন বেশ কিছু মনিষী। রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দের মতো আধ্যাত্মিক পুরুষ ছাড়াও পরবর্তী সময়ে মহান রাজনীতিকের জন্মও ঘটেছে এ উপমহাদেশে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক, সুভাষচন্দ্র বসু, মতিলাল নেহেরু, মহাত্মা গান্ধী উল্লেখযোগ্য। সৃজনমুখী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষ স্বাধীন হয় রক্তপাতহীনভাবে। ভারতবর্ষ স্বাধীনতার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন—সেই মহান নেতৃবৃন্দ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন এবং একই সঙ্গে ইচ্ছাশক্তির প্রেরণা জুগিয়েছেন।
যাহোক, ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। ভারত, পাকিস্তান নামে দুটো রাষ্ট্রের জন্ম হলো—১৯৪৭ সালের আগস্টে। আজকের বাংলাদেশ পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ডে বাঙালির অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু হয়ে গেল। বাঙালি জাতির প্রবল ইচ্ছাশক্তি জেগে ওঠে। এরপর আরেক মহান নেতার আবির্ভাব ঘটে, যিনি কিনা বাঙালির স্বপ্নসাধ পূরণে নতুন করে সংগ্রাম গড়ে তোলেন। তিনি হচ্ছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি জান্তা শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম তীব্রতর হলে ২৩ বছরের অপশাসনের পতন ঘটে একটি যুদ্ধের মাধ্যমে। যে যুদ্ধটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে খ্যাত। ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে আরেকটি সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়, যার নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অভু্যদয়ের পর রাজনীতির নানা সমীকরণের ভেতর দিয়ে স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু হয়। এ জাতিকে উপহার দেওয়া হয় পবিত্র সংবিধান। সংবিধানের মহত্ আদর্শগুলোর প্রতি নৈর্ব্যক্তিক আনুগত্য দেখিয়ে বাঙালি এগিয়ে যেতে থাকে। বিশ্ব দরবারে বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দিয়ে এ জাতিকে ঠিকানায় পৌঁছে দেন। বাঙালি মাথা নোয়াবে না কোনোদিন। কী দুর্ভাগ্য! উন্নয়ন-অগ্রগতির পথকে রুদ্ধ করতে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাঙালির ইচ্ছাশক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায়। ’৭৫-পরবর্তী ছয় বছর বিদেশে বিপন্ন জীবন অতিক্রম করে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসে বাঙালিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলেন। ইচ্ছাশক্তির নবউত্থান ঘটে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
আজ দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে পদার্পণ করেছে। বিশ্ব মানচিত্রে বাঙালি জাতিকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে আত্মমর্যাদার ভিত মজবুত করতে সক্ষম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আছেন বলেই আজ আমার মতো একজন মানুষ রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে নিজেকে গর্বিত বোধ করছি এজন্যই যে, জননেত্রী শেখ হাসিনার দোয়া ও ভালোবাসায় আমার ইচ্ছাশক্তি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। উল্লেখ্য আওয়ামী লীগের প্রায় ১৪ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে একটানা ক্ষমতায় রয়েছে এবং শেখ হাসিনাও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন একই সময়ে। দীর্ঘ এই ক্ষমতাকালীন রাজনীতির বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরনের ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। গভীরভাবে লক্ষ করছি আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের শত্রু হয়ে দাঁড়াচ্ছে কোথাও কোথাও। বঙ্গবন্ধুর সৈনিক সেজে স্বগোত্রীয়দের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতই যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করেন, শেখ হাসিনার ত্যাগ ও সেবার দর্শনকে ধারণ করেন, তারা কখনোই নিজের ঘরে আগুন দেবেন না। আমার প্রিয় নেত্রী তা ভালো করেই জানেন। সে বিশ্বাস নিয়েই আমার ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগাতে কখনো পিছপা হব না। যারা শক্তি অর্জন করে মানুষ মারে, ঘরবাড়ি পোড়ায়, তাদের সে শক্তি সত্ত্বের দ্বারা শুদ্ধীকৃত নয়। আমার নেত্রীর নৈতিক আহ্বান, তা হলো ইচ্ছাশক্তিকে শুদ্ধ করা, এ শক্তিকে মানবমুখী করা। আমরা এ মুহূর্তে গণতান্ত্রিক আহ্বানের সামনাসামনি হচ্ছি। আমরা যদি তার উদার ও গভীর ভাবধারার পথে চলতে পারি, তবেই উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সমর্থ হব এবং প্রগতিশীল মানব সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
লেখক: সংসদ সদস্য; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য
