সেতু চালুর পর বিপাকে ফেরিঘাটের হকাররা

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ১১:০০

শিশু সাজিদ একসময় মাওয়া-কেওড়াকান্দি নৌরুটের ফেরিতে টুকটাক খাবার বিক্রি করত। ফেরিঘাটে তার বাবার নিজের ভাতের হোটেল ছিল। সেই হোটেলে তিন জন কর্মীও ছিল। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বিক্রি ছিল তাদের হোটেলে। বাবার হোটেলের পাশাপাশি নিজের বিক্রি মিলিয়ে ভালোই দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর এখন ফেরিঘাট অনেকটাই জনশূন্য। বাধ্য হয়ে এখন চলে আসতে হয়েছে পদ্মা সেতুর এক প্রান্তে। যাত্রীবাহী বাস সেতুতে ওঠার আগে বাসে চিপস, চকলেট বিক্রি করে। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বিক্রি করতে পারে। আর আগে যখন ফেরিতে খাবার বিক্রি করত, তখন তার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতো। তার মতোই অনেক শিশু-কিশোর পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে ঝালমুড়ি, ছোলা, সেদ্ধ ডিম, চিপস, বাদাম, বিস্কুট, চকলেট, আম, পেয়ারা বিক্রি করে। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বড়রাও এখানে ফেরি করে হরেক রকম জিনিস বিক্রি করে। সব মিলিয়ে বিক্রির জায়গা সীমিত হয়ে যাওয়ার কারণে বিক্রির পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে।

এই নৌরুটে ৮৭টি লঞ্চ, ৫৭টি ফেরি ও দেড় শতাধিক স্পিডবোট ছিল। এখন এসব নৌযানের বেশির ভাগই অন্যত্র চলে গেছে। ফাঁকা পড়ে রয়েছে ফেরিঘাট। সাজিদের কাছে তাদের হোটেলের তিন শ্রমিকের কথা জানতে চাইলে সে জানায়, তাদের কেউ কেউ এখন বাস কিংবা ট্রাকের হেলপারের কাজ করে।

সাজিদের মতোই আগে ফেরিতে নারিকেল-চিড়া বিক্রি করত জাহিদ। সে এখন পদ্মা সেতুর এক প্রান্তে বিক্রি করে ঝালমুড়ি। তারও বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তারা বলে, আগে ফেরিঘাট, ফেরি কিংবা লঞ্চে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা যেত। এছাড়া ফেরি পার হতে দুই তিন ঘণ্টা লাগত বলে যাত্রীরা এটা-ওটা কিনে খেত। অনেক সময় গাড়ি ফেরিতে উঠতে দীর্ঘক্ষণ ঘাটে অপেক্ষা করত। এসব কারণে তখন যাত্রীরা সময় কাটাতে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে খাবারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনত। কিন্তু এখন সেতুতে ওঠার আগে অল্প সময়ের জন্য গাড়ি থামে। গাড়ি থামার পরপর একসঙ্গে অনেক ফেরিওয়ালা গাড়িতে উঠলেও সেভাবে বিক্রি হয় না। এছাড়া ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িগুলো এখানে না দাঁড়ানোয় ক্রেতার সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

পদ্মা সেতু চালুর খবরে এই পথে চলাচলকারী যাত্রীদের মনে যে রকম উচ্ছ্বাস ছিল, ঠিক তার বিপরীত অবস্থা ছিল এসব হকারের মনে। তারা আগেই ধারণা করেছিল, সেতু চালু হলে পেশার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তারা জানায়, জাজিরা, শিমুলিয়া ঘাটে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করেন অনেকটা বিনা পুঁজিতে। পদ্মার দুই পাড়ে নানা পণ্য হকারি করে যারা জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের আগে খরচ বাদ দিয়ে দৈনিক গড়ে ৮০০ থেকে হাজার টাকা আয় হতো। কারো কারো ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকাও আয় হতো। এখন সেই আয় অনেকটাই কমে গেছে। তার পরও জীবিকার প্রয়োজনে এসব মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফেরিওয়ালা পদ্মা সেতু প্রান্তে হকারি পেশাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকেই হকারি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন। কেউ বাড়ির পাশে ছোট করে টং দোকান দিয়েছেন। কেউ কৃষিকাজ শুরু করেছেন। কেউ আবার পদ্মায় মাছ ধরার পেশায় যোগ দিয়েছেন। অনেকে আবার কাজ হারিয়ে নতুন কাজের সন্ধানে রাজধানীমুখী হচ্ছেন।

ইত্তেফাক/এমআর