রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, ‘আমরা বাঙালিরা নতুন কিছু না করে থাকতেই পারি না।’ রবীন্দ্রনাথের বহু শিক্ষার মতো এটাও যে আমরা যত্ন সহকারে ভুলে গিয়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এখন আর আমরা সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সমাজসেবা, বাণিজ্য কোনো কিছুতেই নতুন কোনো ছাপ রাখতে পারছি না। যা অতীতে ছিল, তারই শুধু অনুসরণ ও অনুগমন চলছে সর্বত্র। আর এরই হাত ধরে রাজনৈতিক অথবা সামাজিক আন্দোলনের গতি রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমেও কোনো সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সেই প্রবণতা একপ্রকার শূন্যে এসে ঠেকেছে। কারণ একটাই। গণ-আন্দোলনের নতুন কোনো ফরম্যাট গড়ে উঠতে পারেনি। সর্বত্রই শৃঙ্খলার অভাব, নিত্যনতুন স্লোগানের অভাব, জাতীয় স্বার্থকে প্রধান হাতিয়ার করে একটি জাতীয়তাবাদের ঝড় তোলার নিখুঁত চিত্রনাট্যের অভাব—অনেক, অনেক অভাব। গত ২০ বছর ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে সামাজিক পট পরিবর্তন হচ্ছে না। কোনো ইস্যুই সাফল্য পাচ্ছে না। মূলত কোনো আন্দোলনের ইস্যুই এখন আর দীর্ঘমেয়াদি থাকতে পারছে না। হয় এক দিন বা দুই দিন, না হয় সপ্তাহের ইভেন্টে পরিণত হচ্ছে সব আন্দোলনের ইস্যু। ২০২২ সালের সমাজ, জীবন, প্রজন্ম অনেক বদলে গিয়েছে। কিন্তু সেই বদলের চেহারা বুঝে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি তৈরি হচ্ছে না। তাই আজ বাঙালি নতুন কিছু করার কৌশলটিও যেন ভুলে বসে আছে।
আজকের এ অবস্থাটা বাঙালি কিন্তু এক দিনেই লাভ করেনি। সেই কবে শুরু হয়ে গিয়েছিল মানুষকে ভয় দেখিয়ে এবং বোকা বানিয়ে সংবিধানের ওপর সহস্র কোপ মারার পদ্ধতি। তাতে সংবিধানের ইনক্রিমেন্টাল ক্ষয় হয়েছে ক্রমান্বয়ে। গণতন্ত্রের এই ক্রমান্বিত অবক্ষয় নিশ্চিত করেছে আমাদের পশ্চাদপসরণের রাস্তা। এই প্রবণতা আজকের নয়। এটা শুরু হয়েছিল বেশ খানিকটা আগেই। এ পরিবর্তনটা প্রকারান্তরে আমাদের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। অন্য দিকে তা কারো কারো আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে কয়েক বছর পর থেকেই শুরু হয়েছে মৌলিক অধিকারের এ পশ্চাদপসরণ। একের পর এক আনা হয়েছিল সংবিধানে সংশোধন। আদর্শজনিত উদ্বেগ থাকলেও কারো মুখ খোলার সুযোগ রাখেনি সে দিনগুলোর রাষ্ট্রব্যবস্থা। ধর্মের নাম দিয়ে, ধর্মের বিরোধিতা না করার ধুয়া তুলে তারা করে গিয়েছে একের পর এক সংশোধন। বিষয়টি কৌশলগত এবং সংবেদনশীল বলে পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থাও মেনে নিয়েছে মুখ বুজে। ভুলের পাহাড় তাই আজ আমাদের গ্রাস করেছে। সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোনো উপায়ই যেন আর খোলা নেই। আমরা আজ যে যুগে প্রবেশ করেছি, সেখানে কর্তৃত্ববাদ, সংখ্যা-গুরুবাদ, জনপ্রিয়তাবাদ সব মিলেমিশে দেশের প্রজাতন্ত্র এবং তার সব প্রতিষ্ঠানকে বিপদগ্রস্ত করতে শুরু করেছে। এ যেন আজকের দিনের অঘোষিত জরুরি অবস্থা। এর হাতে বন্দি এবং জিম্মি হয়ে আছে দেশের মানুষ।
বাকস্বাধীনতা, সাম্যের অধিকার ইত্যাদি সংবিধানস্বীকৃত বেশ কিছু মৌলিক অধিকার ইতিমধ্যেই এমনভাবে সংকীর্ণ কিংবা লুপ্ত করা হয়েছে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি। কিন্তু তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই অনেকেরই। আগেকার পর্বের সঙ্গে বর্তমান পর্বের যে পার্থক্য, তাতে যেন বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই অনেকেরই। সেই সুযোগেই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সংবিধানের চিরসত্য উপাদানগুলো। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তরফে কিংবা বৃহত্তর নাগরিক পরিসরে সংবিধানের ওপর এই ক্রমান্বিত আক্রমণের বিষয়ে একটা বিরাট অবহেলার ভাব সুস্পষ্ট। এরই হাত ধরে বাড়ছে বিভাজিত সমাজ, বিভাজিত সম্প্রদায় এবং বিভাজিত রাজনৈতিক কালচার। এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে বরাবরই এতে ক্ষোভ ছিল, এখনো আছে। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা সেগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে বরং তাত্ক্ষণিক লাভের আশায় মানবদরদি প্রকল্পগুলো গরিবের হাতে, নারীদের হাতে, মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাদের ধারণা, এগুলোই ভোট লাভের ক্ষেত্রে বেশ ফল দেবে। এসব করতে গিয়ে তারা ভুলে গিয়েছে রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক চাহিদাকে রক্ষা করতে, বিভেদের মধ্যে মিলনের দেশে নিজেদের নিজস্বতা রক্ষা করতে। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, গত কয় বছরে পরিকাঠামোগত কাজ অনেক হয়েছে। সেদিকেই যেন তাদের দৃষ্টি ছিল সবচেয়ে বেশি। কেউ মূল কাঠামোতে চোখ ফেরাবার সাহস পায়নি কিংবা এখানে কোনো পরিবর্তন করতে চায়নি। তাই আগের সেই মৌলিক কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার কোনো প্রচেষ্টাই তাদের ছিল না।
ভুল যা-ই করে থাকুক, যতটুকুই করে থাকুক—যেহেতু পরিকাঠামোগত অনেক উন্নতি হয়েছে, তাই চাইব সেগুলোর যেন আরো উন্নতি ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়। অনেক শিল্প-প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে অথবা প্রাইভেট লেভেলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রুগ্ণ করে কিংবা রুগ্ণ ভেবে। সেগুলো যেন আবার জেগে ওঠে। চাইব একটা প্রতিযোগিতামূলক কর্মসংস্কৃতি গড়ে উঠুক, যাতে সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে মিলেমিশে একটা ভারসাম্য বজায় থাকে। আমাদের সম্ভাবনা আছে কৃষিশিল্প, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং ওয়েলফেয়ারের সমন্বয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্র হয়ে ওঠার। সেই সম্ভাবনার প্রতি আরো সুবিচার হোক। রাষ্ট্র বেরিয়ে আসুক কুসংস্কার আর অন্ধকার পেরিয়ে। মৌলিক কাঠামোকে শক্ত করে ধরে রাখুক রাষ্ট্র। কোথাও ভুল থাকলে শক্ত হাতে রাষ্ট্র তার সংশোধন করে ফেলুক। দর্শন আর দেশপ্রেম সংজ্ঞায়িত হোক রাষ্ট্রের মৌলিক পরিকাঠামোর পথে—জন্মের অঙ্গীকারের হাত ধরে।
ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণমুখী রাষ্ট্রদর্শন যেখানে যে কোনো নাগরিকের মাথার ওপরের ছাদ নিশ্চিত করার কথা বলে, সেখানে একটা নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের নিরাশ্রয় করার দায়িত্ব সানন্দে স্কন্ধে তুলে নেয় দেশের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। তারা ইতিমধ্যে বহুবার প্রমাণ করেছে, যেনতেন প্রকারে সংখ্যালঘুদের ভয়ে সিঁটিয়ে রাখাই তাদের পছন্দের রাষ্ট্রকর্ম। সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদী কার্যকলাপের এসব প্রমাণিত নমুনা চলছে বাংলাদেশে, চলছে ভারতে। এখানে এখন ভোট হয় সাম্প্রদায়িক ইস্যুকে সামনে রেখে; এখানে সমাজ চলে বিভাজনের মন্ত্র পড়ে। ধর্মীয় বস্ত্রধারীরা হুমকি দেয় সংখ্যালঘু পেটানোর। শাবল-কোদাল কিংবা লাঠি-আগুন হয়ে ওঠে সংখ্যালঘু নিষ্পেষনের দর্পিত যন্ত্র। আবার ভয়-সন্ত্রাস আর অসহিষ্ণুতার আবহের মধ্যেও রয়ে যান কিছু মানুষ, যারা সংখ্যালঘু যুবকের প্রাণ বাঁচান সংহারকামী জনতার হাত থেকে, নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে। জোর গলায় প্রতিবাদ করেন—‘আমি হিন্দু, আর ও মুসলমান’ কিংবা ‘আমি মুসলমান, আর ও হিন্দু’—তাতে কি! আমরা তো বন্ধু! দুঃসময়ে আমরা একে অপরকে সাহাঘ্য করি। বুলডোজার যদি মন্দির কিংবা মসজিদ গুঁড়িয়ে দিতে আসে, তার সামনে একলা হলেও রুখে দাঁড়াব, দাঁড়াবই। এমন বাস্তবতাও যেমন আছে, তেমনি পাশাপাশি ওটাও আছে। হিংসা আসছে দুর্নিবার গতিতে বারবার। রুখে দাঁড়ানো যুবকের চোখের সামনেই হতবল সহিষ্ণুতার শিথিল অর্গল ভেঙে হরণ করতে চেয়েছে জীবনের গৌরবের রূপ। তবু আমাদের শেষ ভরসা ঐ ধর্মনিরপেক্ষ যুবকদের ওপরই। তাদের শুভবুদ্ধির বলয়ই আমাদের বাঙালি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহিষ্ণুতার শেষ আশ্রয়।
এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ নয়, এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ হতে পারে না—এ বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই আজ আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। নিষ্ক্রিয় আলস্যে বসে থাকার সময় এটা আমাদের নয়। এটা আমাদের সমন্বিত প্রতিবাদের সময়, জেগে ওঠার সময়। মনে রাখতে হবে, পুরো পৃথিবীটা এখন একটা দেশ। প্রতি মুহূর্তে সব খবরই সবাই সহজে পেয়ে যান। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিংবা ভারতের কোনো প্রান্েত ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক জুলমবাজির খবর মুহূর্তের মধ্যেই গোটা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। লুকিয়ে রাখা যায় না কোনো কিছু। ঘুরিয়ে বলার দিনও প্রায় শেষ। সুতরাং সংখ্যালঘু অত্যাচারের চিত্রকররা যদি ভেবে থাকে যে, অন্য কেউ তাদের দেখছে না—তবে তারা ভুল করছে। মানুষ তাদের দেখছে, পৃথিবী তাদের দেখছে। যারা আজকের পৃথিবীতে সংখ্যালঘুর হাজার হাজার হেক্টর জমি, লক্ষ-কোটি টাকার সম্পদ প্রায় বিনা মূল্যে পেয়ে যাওয়ার লোভে সংখ্যালঘুদের দেশ ছাড়ার কাজে লিপ্ত থাকে, তাদের পরিচয়টা আজ আর গোপন থাকছে না—তা বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা ভারত যেখানেই হোক।
কিছুদিন আগে কলকাতা বেড়াতে গিয়েছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে চোখে পড়ল কোনো এক গেরুয়া নেতার বিশাল এক বিলবোর্ড। সুস্পষ্ট করে লেখা—আগামী এক দশকেই ভারত হবে হিন্দু রাষ্ট্র। ভারতে বিজেপি সামনেও যদি জয় করে নেয় ভোটযুদ্ধ, তবে সেখানে তো বটেই—পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্বের রাজনীতি জাঁকিয়ে বসবে। বাংলাদেশ তো এক ধাপ এগিয়েই আছে! রাষ্ট্রধর্ম তো ইসলাম করাই আছে এখানে! এখন শুধু কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠীর ভোট জয়। তখন পাশাপাশি এ দুইটি রাষ্ট্রে জেঁকে বসবে মৌলবাদী ধর্মীয় রাজশাসন। সংখ্যালঘুরা আরো বিপন্ন হবে। বাড়বে গো-রক্ষা, লাভ জেহাদ, ধর্মান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা, স্বাধীন ধর্মানুষ্ঠান পালনে নিষেধাজ্ঞাসহ সংখ্যালঘু মানুষকে কোণঠাসা করার নানারকম বিধিনিষেধ। শুধু রাজনীতি নয়, বাংলার অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি সবকিছুই আপাদমস্তক বদলে দেওয়ার প্রস্ত্ততি নিয়ে আসবে। জয়জয়কার ধ্বনি উঠবে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের। তার কল্পনায় থাকবে না কোনো বহুত্বের ধারণা। তার মন্ত্রে থাকবে—এক দেশ, এক ধর্ম। এই ধর্মরাষ্ট্রের দেহে ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ লীন হয়ে যাবে কি না, তার পরীক্ষা হবে সামনের নির্বাচনে। সুতরাং, সাধু সাবধান! যা ভাবার, আগেই ভাবো—ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।
লেখক: কলাম লেখক
