বিপর্যয়ের মুখে চামড়াশিল্প

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২২, ০০:৪৬

আমাদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় বড় খাতের একটি চামড়াশিল্প। বর্তমানে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা দেশে এবং দেশের বাইরে প্রচুর বিদ্যমান। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। কিন্তু এজন্য শিল্পটিকে হতে হবে পরিবেশবান্ধব। একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে আয়ের খাতগুলোর যেমন যথাযথ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি সম্ভাবনাময় খাতগুলোর উন্নয়নেও ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য চামড়াশিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। যা সুষ্ঠু পরিচালনা ও যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও এ খাতের বিকাশ সঠিকভাবে হচ্ছে না। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো আমাদের চামড়ার বাজার। প্রতি বছর কোরবানির ঈদে চামড়ার দাম কমে যাওয়া একটা মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এছাড়াও ট্যানারিগুলো স্থানান্তর, অর্থ সংকটের মতো বড় সমস্যার কারণে এশিল্পের ধস নামছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। যার অন্যতম উদাহরণ, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া।

উল্লেখ্য যে, আমরা চামড়ার জুতা কিংবা চামড়া জাতীয় পণ্য কিনতে গেলে হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়। অথচ সেই চামড়াটাই এখন ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে পারছে না মানুষ। আবার এসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ট্যানারি মালিকরাও চামড়া কিনছে না সঠিক মূল্য দিয়ে। যারা চামড়া সংরক্ষণ করে তাদের ভাষ্য হলো, যে পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণ করা আছে, সেগুলো এখনো বিক্রি করতে পারেনি। তাই নতুন করে চামড়া সংগ্রহ করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তাদের কাছে নেই। যে কারণে অল্প টাকায় চামড়া কেনা সম্ভব হলে কিনছে, অন্যথায় কিনছে না।

বিগত কয়েক বছরের মতো এ বছরও চামড়ার দাম কম। সবকিছুর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে অথচ বছরের পর বছর চামড়ার দাম কমছে। মূলত এটা একটা মারাত্মক সিন্ডিকেটের আওতায় পড়েছে। এবছরও চট্টগ্রামে চামড়া বিক্রি হয়েছে কম দামে। অনেকে সঠিক দাম না পেয়ে দান করে দিচ্ছে বলেও জানা গেছে। এ বছর কোরবানি দিয়েছেন এমন একজন জানান, এখন মানুষ আর চামড়া বিক্রি করার চিন্তা করে না। কারণ চামড়ার কোনো দাম পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানায় দান করে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আড়তদাররা সেই মুখস্থ কথাটাই বলে থাকেন প্রতি বছর। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম, তাই ট্যানারি মালিকরা বেশি দাম দিতে চান না। মূলত এ কারণেই চামড়ার সঠিক দাম পাচ্ছেন না কেউই। এবার বেশির ভাগ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করা থেকে বিরত ছিলেন। এটা শুধু চামড়াশিল্পের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে এক সময়। বর্তমানে আমাদের দেশে চামড়াশিল্পের বিপর্যয় চলছে। আর এ বিপর্যয়ের মাত্রা ২০১৯ সাল থেকেই ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে এক সময় সত্যি সত্যি আমাদের চামড়াশিল্প হারিয়ে যাবে। তাই এসব সমস্যার সমাধান হওয়া জরুরি। সরকারের উচিত এসব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা। এবং যেসব ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই চামড়াশিল্পের সুদিন ফিরবে বলে আমি মনে করি।

এ ছাড়াও চামড়া রপ্তানির জন্য বাইরের দেশগুলোর দিকে না তাকিয়ে আমাদের দেশে কীভাবে প্রক্রিয়াজত করা যায় এবং চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করা যায়, সেটা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে। প্রয়োজনে পৃথিবীর যেসব দেশসমূহ চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করে তাদের সঙ্গে যৌথউদ্যোগে আমাদের দেশে শিল্পকারখানা স্থাপন করা যেতে পারে। এতে করে দেশের মানুষের চাহিদাও মিটবে এবং চামড়াজাত দ্রব্য বাইরের দেশে রপ্তানি করে আরো অধিক মুনাফা অর্জন করা যাবে। আমরা যেহেতু নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করতে পেরেছি, আমরা অবশ্যই এই চামড়াশিল্পকেও রক্ষা করে বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারব।

লেখক : শিক্ষার্থী, ওমরগণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন