সাধারণত বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আড্ডা ও নানারকম খেলাধুলায় মেতে ওঠে শিশুরা। মাঠে নানা রকম খেলায় আনন্দঘন সময় পার করে তারা। এই ক্রীড়া-ধারা চলতে থাকে কৈশোর-যৌবন এমনকি জীবন জুড়ে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও খেলাধুলার মাঠগুলো প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের পরিক্রমায় যুগে যুগে নানা খেলার আধিপত্য ছিল। বাংলার প্রতিটি প্রান্তরে শিশু-কিশোরদের মজার খেলা কানামাছি, বৌছি, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, ঢাংগুলি, মারবেল, হাঁসধরা, রশিটানা, নারিকেল গাছের ডাল নিয়ে ক্রিকেট ও পাতা নিয়ে পাখা বানিয়ে উড়ানো, ওপেন টি বায়োস্কোপ, মল্লযুদ্ধ, লাঠিখেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, মোরগ লড়াই, কড়ি, ধাপ্পা, কুতকুত, বিস্কুট খেলা, যেমন খুশি তেমন সাজ, পুতুলের বিয়ে, চড়ইভাতি, এলাডিং বেলাডিং, সাত চাড়া, বিয়ের গান উল্লেখযোগ্য। ১০-১৫ বছর আগে এসব খেলা প্রায়শই দেখা যেত গ্রামীণ খেলার মাঠগুলোতে। এলাকার নানান পেশার মানুষ মাঠের চারপাশে এসে এসব খেলা দেখত। সূর্য ডোবার আগে খেলা বন্ধ করে যে-যার মতো বাড়িতে চলে যেত। এই দৃশ্য বড্ড পরমানন্দের, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের খেলার মাঠগুলো এখন আর খালি পড়ে নেই। মাঠগুলোতে কেউ বাড়ি করছে, কেউবা বানাচ্ছে দোকানপাসারি। যার কারণে গ্রাম পর্যায়ে খেলাধুলার যে চিরকালীন চর্চা তা হারিয়ে যাচ্ছে।
খেলার মাঠের অভাবে কিশোর-কিশোরী খেলার পরিবেশ পাচ্ছে না। ফলে, তাদের মেধার বিকাশ হচ্ছে না যথাযথভাবে। শরীরচর্চা, বিকালের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। খেলাধুলার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় অনেকেই মোবাইল গেইমিংয়ে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। মোবাইল ও টিভির পর্দায় সময় কাটাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিভিন্ন প্রলোভনে পড়ে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং। খেলাধুলার পরিবেশ বিলুপ্ত হওয়ার কারণে জড়িয়ে যাচ্ছে মাদকের সঙ্গে, যা সুন্দর ও সমৃদ্ধি জীবন গড়ে তুলতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমরা জানি, খেলাধুলার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। খেলাধুলার মাধ্যমে শরীর, মন দুটোই ভালো থাকে। খেলাধুলা কিশোরদের মনে হার মেনে নেওয়া সক্ষমতা শেখায়, প্রতিপক্ষের প্রতি সহিষ্ণু আচরণ করতে শেখায়। খেলায় জিতলে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ঘটে, খেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কৌশল ভবিষ্যতে কিশোরদের অনেক সাহায্য করে। কাজেই, খেলার মাঠ ধ্বংসের মাধ্যমে শিশু-কিশোদের জীবনের এই সোনালি সময়কে ধ্বংস করে আগামীর দিনে ভালো নাগরিক আশা করা কতটা যুক্তিযুক্ত?
নগরায়ণ ও ক্ষুদ্র স্বার্থে কারণে খেলাধুলা করার মাঠগুলোর যে ক্ষতি হচ্ছে, তার নেতিবাচক প্রভাব সবার ওপর পড়বে না এমন নিশ্চয়তা কে দিতে পারবে? হাজারও প্রশ্ন মনে উদয় হলেও আমরা এখন নিবার্ক। যেন আমাদের করার কিছুই নেই! আমরা কিশোর-কিশোরীদের একটি সুন্দর পরিবেশ দিতে পারলে আগামীর সমৃদ্ধ ও সোনার বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হবে তারাই। অথচ আমরা যদি তাদের জীবন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করি, তবে ভবিষ্যতে দেশে জনসংখ্যা বাড়বে, সুনাগরিক নয়। তাই আমাদের উচিত আমাদের শিশু-কিশোরদের জন্য ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশ তথা মুখরিত খেলার মাঠ ফিরিয়ে আনা। তাদের খেলাধুলার পরিবেশের যেন বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। মোটকথা, দখল-দূষণ থেকে মুক্ত করে খেলার মাঠের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে—এটাই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
