সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ!

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২২, ০২:৫৬

সড়ক দুর্ঘটনা যেন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি দিন কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝরছে তরতাজা প্রাণ, খালি হচ্ছে মায়ের বুক; মুহূর্তেই ভেঙে যাচ্ছে স্বপ্ন। এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা অত্যন্ত উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়ে উঠেছে। 

সাম্প্রতিক এক জরিপ মতে, গত দুই বছরে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। মূলত অনিয়ম বা অবস্থাপনার কারণে সহস্র প্রাণ সড়কে ঝরে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দুর্ঘটনায় নিহত মায়ের পেট ফেটে বাচ্চা বের হয়ে যাচ্ছে—জন্মকালেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার নবজাতক! উদ্বোধনের দিন থেকেই পদ্মা সেতুতে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা!

সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল যেন এক আতঙ্কের নাম। গবেষণায় উঠে এসেছে, মোটরসাইকেলে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু বরণ করে বাংলাদেশে। দুই চাকার এই যানটির উৎপাদন বাড়ায় এটি এখন সহজলভ্য বিধায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাইক দুর্ঘটনা। জুন মাসে সড়কে যতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে শীর্ষে আছে মোটরসাইকেল।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত জুন মাসে দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ১১০টি। এতে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৪৭ জন এবং আহত আড়াই হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে ৮৫৮টি। এতে আহত হয় ৭৫২ জন এবং নিহত হয় ২৭৬ জন। বাকিগুলো বাস, মিনিবাস, ট্রাক, ট্রাক্টরের মতো ভারী যানবাহন, মাইক্রোবাস, পথচারী ইত্যাদির অসাবধানতা ও অনিয়ন্ত্রিত ড্রাইভিংয়ের কারণে ঘটেছে। বাসা থেকে বের হয়ে আবার যে বাসায় ফেরা হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সবসময় মনে হয় যেন মৃতু্যছায়া তাড়া করছে। এমন এক ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে আমাদের। এমন কি করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির সময় পুরো দেশে কঠোর বিধিনিষেধকালে মোট ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকাকালীনও সড়ক দুর্ঘটনা থামেনি—যা চরম উদ্বেগজনক। বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ডেলিভারিং রোড সেফটি ইন বাংলাদেশ :লিডারশিপ প্রায়োরিটিস অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভস টু ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।

এত এত দুর্ঘটনা ও প্রিয়জন হারানো জর্জরিত মানুষের বাঁধ-ভাঙা কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। কারণ, এর পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে কতকগুলো কৃত্রিম সংকট, যার পুরো দায় আমাদেরই। ঢাকা শহরে চলাচল করা যানবাহনের অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ বা ফিটনেস হারিয়েছে বহু আগেই। তবু সড়কে তাদের আধিপত্যের বিন্দুমাত্র কমতি নাই। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, ইত্যাদির কারণে পুরা শহরকে অস্থিরতায় ছেয়ে ফেলছে লক্কড়-ঝক্কড় যানগুলো। প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা, ফুটপাত দখল করে হকারদের ব্যবসা পরিচালনা, মহাসড়কে ছোট বা স্বল্প গতির যানবাহন চলাচল, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা বা যথাযথ প্রয়োগের অভাব, জনসভা, পথচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা, ফুটওভার এবং জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে অনীহা ইত্যাদি মোটা দাগে ভূমিকা রাখে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে। আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, অদক্ষ চালককে লাইসেন্স প্রদান, ড্রাইভারদের মাদক গ্রহণ, সিগনালবিহীন হঠাৎ লাইন ক্রসিং, আইনের প্রতি অসহনশীল আচরণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ইত্যাদিও উল্লেখযোগ্য।

এমতাবস্থায় দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, যথাযথ ট্রেনিং, প্রয়োজনভেদে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সড়ক ও চৌরাস্তা মনিটরিংসহ নানান উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি। নিয়মিত নিরীক্ষণ করার পাশাপাশি প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না ভেবে দেখার সময় এসেছে। মহাসড়কগুলো চার লাইনে উন্নীতকরণ এবং বিপজ্জনক বাঁকগুলোতে লেন্স স্থাপন করাও জরুরি। এছাড়া অপ্রোয়জনীয় হর্ন ড্রাইভারের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, অস্থির করে তোলে, যা দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখে। তাই ড্রাইভারদের কাউন্সিলিং দরকার। এক্ষেত্রে পরিবহন সমিতিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, তদারকির ওপর জোর দিতে হবে। লাইসেন্স বাণিজ্য রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, যথাযথ উদ্যোগ ও যথা শিগ্গির তার শক্ত প্রয়োগ না করলে সড়ক দুর্ঘটনায় শীর্ষে থাকা জিম্বাবুয়েকেও পেছনে ফেলতে বাংলাদেশের খুব বেশি দিন সময় লাগবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন