জ্যাম ঠেলে অফিসে যাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই শহরে বাস করতে হলে জ্যামকে সঙ্গী করতেই হবে। এই জ্যামের কথা চিন্তা করে মতি ভাই খুব ভোরেই অফিসে যাওয়ার প্রস্ত্ততি নেন। তিনি যখন অফিসের প্রস্ত্ততি নিচ্ছেন, স্ত্রী তখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। নাস্তা পানি তৈরি করার কোনো বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও নেই। শুধু যাওয়ার সময় কোনোরকম দরজাটা বন্ধ করার জন্য ওঠেন। তাও একরাশ বিরক্তি নিয়ে মুখ ভেংচি দিয়ে কটু বাক্য প্রকাশ করেন। মতি ভাই এসব শব্দের সাথে আগে থেকেই পরিচিত। এখন এসব শোনা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ করে আজ তার স্ত্রীর মধ্যে এক পরিবর্তন দেখা দিল। তিনি কটু বাক্য বিনিময় করলেন না। স্ত্রীর এই পরিবর্তন দেখে তিনি হতবাক। শার্টের বোতাম মারতে মারতে স্ত্রীকে বলছেন, ‘বেগম সাহেবার কী হয়েছে?’
‘কেন? কিছুই হয়নি।’
‘না মানে, সকাল সকাল তোমার মুখের শব্দ বোমা না শুনলে ভালো লাগে না।’
‘আজকে আমার মন ভালো নেই।’
‘কেন মন ভালো নেই?’
‘তা তোমাকে বলতে হবে নাকি?’
ধমক শুনে মতি ভাই কথা আর বাড়ালেন না।
তিনি কোনোরকম ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠলেন। বাসে উঠার পর দেখলেন ভেতরে তিল পরিমাণ জায়গা খালি নেই। এতে তিনি বিচলিত হয়নি। কারণ প্রতিদিনই তার এরকম পরিস্হিতির মুখোমুখি হতে হয়। বাস ভাড়া দিতে গিয়ে বুঝলেন কিছু একটা মিসিং। মানিব্যাগটা যে কে মেরে দিল তা বুঝতেও পারেননি। ভাড়া না থাকায় মতি ভাই বেশ চিন্িতত হয়ে পড়লেন। গাড়ির হেল্পার এসে সাফ জানিয়ে দিল, ‘এসব অভিনয় বাদ দেন। তাড়াতাড়ি টেকা বাইর করেন। আপনেগো মতো বহু লোকের লগে আমগো পরিচয় আছে। আমরা মানুষ বেইচা খাই। এইগুলা আমগো লগে চলব না।’
‘এই মামা, এরকম আজেবাজে কথা বলছেন কেন?’
‘আজেবাজের কী দেখছেন? এহনোতো শুরুই করি নাই।’
তর্কাতর্কি কিছুক্ষণ চলার পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করলেন। নামার সময় হেল্পার একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘যা ব্যাডা, এইরকম কঞ্জুস আমি আর দেহি নাই।’
অফিসে প্রবেশ করামাত্রই বস ডাকলেন। মতি ভাই সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে সাত মিনিট দেরি হয়েছে। কোনোরকম ভূমিকা ছাড়াই বলতে লাগলেন, ‘মতি সাহেব, চাকরিবাকরি ভালো না লাগলে ছেড়ে দেন। মজা মাস্তি করেন। কী দরকার এত কষ্ট করে অফিসে আসার?’
‘স্যরি স্যার, আর দেরি হবে না।’
এবার বস গরম হয়ে গেলেন। আর তিনি গরম হলে অনর্গল ইংরেজি মারতে থাকেন। কী বলেন উনি ছাড়া কেউই বুঝেন না।
বসের বকুনি খেয়ে নিজের ডেস্কে এসে বসলেন। পাশের দুই কলিগ উচ্চস্বরে হাসছে আর বলছে, ‘মতি ভাই কি ঢলাডা না খাইল, হা হা...!’
কোথায় তারা একটু সাপোর্ট দিবে তা না, তারা এ নিয়ে হাসছে।
বাসায় এসে গোমড়া মুখে বসে আছেন তিনি। স্ত্রী এসে বললেন, ‘এরকম মুখ কালো করে বসে আছো কেন?’
‘আজকে আমার মন ভালো নেই।’
‘কি, তুমি আমার কথা নিয়ে টিটকারি করছো?’
মতি ভাই ভুলেই গেছেন সকালে তার স্ত্রীই এই কথা তাকে বলেছিলেন। স্ত্রী মতি ভাইকে বকাঝকা করেই যাচ্ছেন। তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে শুনছেন। স্ত্রী কি বুঝবেন—সত্যিই আজকে তার স্বামীর মন ভালো নেই।
