শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গন্তব্য যখন ঝরঝরি ঝরনা 

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২২, ১১:৪২

বাংলার প্রকৃতি অপূর্ব, প্রতিটি ঋতুতে এটি আলাদা আলাদা রূপ ধারণ করে। বর্ষায় বাংলার প্রকৃতি বর্ষায় অনন্য হয়ে ওঠে। নদ-নদী, হাওর, পাহাড়-পর্বত, সমতল ভূমি সবকিছু সবুজে সবুজে ভরে ওঠে। বাংলার প্রকৃতিতে যখন সাজসাজ রব ধ্বনি ওঠে তখন ভ্রমণ পিপাসুরা বেরিয়ে পড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যের খোঁজে। 

গত ১২ জুলাই লক্ষ্মীপুর সদর থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ১৫ জন শিক্ষার্থীও বেরিয়েছিলাম প্রকৃতির সৌন্দর্যের খোঁজে। আমাদের গন্তব্য ছিলো চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু-মীরসরাই রেঞ্জে অবস্থিত ঝরঝরি ঝরনা। 

রাত ৪টায় মাইক্রোবাসে করে আমাদের যাত্রা শুরু। ভোর ৬টায় সীতাকুন্ডের পন্থিশীলা বাজারে পৌঁছাই। পন্থিশীলা বাজারে সকালের নাস্তা সেরে মিনিট দশেক হেঁটে আমরা পার হই বাজারের রেললাইন। রেললাইন পার হয়েই আমাদের মূল যাত্রা শুরু হয়।  

আমরা যখন রেললাইনের পাশ দিয়ে সমতল ভূমিতে হাঁটতে শুরু করি। সূর্য তখন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পূর্বাকাশে থেকে উঠতে শুরু করেছে, সকালের মিষ্টি রোদ পরশ ভোলাচ্ছে শিশিরসিক্ত দুর্বা ঘাসের মাঝে। ঝরঝরি ঝরনা মূলত অনেক ঝরনার সমন্বয়ে তৈরি যা অনেকের কাছে ঝরঝরি ট্রেইল নামেও পরিচিত। এর প্রথম ঝরনাটি হলো ঝরঝরি আর শেষেরটি হলো মূর্তি ঝরনা। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সীতাকুন্ডু-মিরসরাই রেঞ্জে অবস্থিত ঝরনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেও ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে এখনো এই ঝরনা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। 

যেখানে চোখ জুড়ানো প্রকৃতির হাতছানি

সমতল ভূমিতে মিনিট ১৫ হাঁটার পর দেখা মেলে ঝিরি পথের। এই পথের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট ছোট পাহাড়ি খাল। সকালের মিষ্টি আলো পানির উপর এসে রূপালি এক আভা তৈরি করে আর সেটি পানির নিচে থাকা ছোট ছোট পাথরগুলোর সৌন্দর্য যেন বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। 

দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় আর মাঝ দিয়ে ঝিরি পথ, কিছুক্ষণ পর পর পাখির কিচ কিচ শব্দ। এভাবে ঝিরিপথে মিনিট বিশেক হাঁটার পর খুঁজে পাই পাহাড়ি রাস্তা। এই রাস্তাটি বেশ খাঁড়া হওয়াতে ক্লান্তি এসে যায় কিন্তু সকালের নির্মল বাতাস সেটি স্থায়ী হতে দেয়নি। এরপর আবার নামতে শুরু করেছি। 

এভাবে পাহাড়ে উঠছি আর নামছি কিন্তু ঝরনা কোথায় সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। একটা সময় মনে হয়েছে এত দূর পথ পাড়ি দেওয়ার পরও যখন ঝরনা পাচ্ছি না। তখন ফিরে যাওয়াই ভালো। ঝরনা খুঁজে পাওয়ার অন্য কোন রাস্তাও আমাদের হাতে ছিল না। আমরা কোনো গাইড নেইনি। ভোরে জনমানবশূন্য এই পাহাড়ে কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভবনা একেবারে ক্ষীণ, তার ওপর মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই। তবে হাল ছেড়ে দেইনি কেউ। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরই শোনা গেলো পানির ঝর ঝর শব্দ। সবাই তখন আনন্দে আত্মহারা। অবশেষে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরি ঝরনা! 

ঝরনার পানিতে যখন হাত পা ছেড়ে দেই, তখন সব ক্লান্তি উড়ে ছাই। পাহাড়ের উপর থেকে পানি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য কী যে সুন্দর! সময়ক্ষেপণ না করে কেউ কেউ চোখ ভরে ঝরনা দৃশ্য দেখতে শুরু করেছে, কেউ কেউ নিজেকে ঝরনার পাশে ফ্রেমবন্দি করে নিচ্ছে, কেউ কেউ ঝরনার পানিতে ভিজতে শুরু করে দিয়েছে। 

ঝরঝরি ঝরনার দৃশ্য উপভোগ করে আমরা আরও সামনে এগিয়ে যাই।  ভেবেছি ঝরঝরি ঝরনাই সবচেয়ে সুন্দর। কিন্তু সামনে যে আরও সুন্দর কিছু অপেক্ষা করছে সেটা জানা ছিলোনা। ঝরঝরি ঝরনা থেকে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলে অনেকগুলো ক্যাসকেড আছে। খাঁজ কাটা এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে স্বর্গের কোন রাস্তা ধরে হাঁটছি। এক এক করে অনেকগুলো ঝরনা দেখার পর আমরা পৌঁছে যাই মূর্তি ঝরনার সামনে। 

প্রকৃতির সৌন্দর্যের খোঁজে

পথে পিচ্ছিল পাথর আর দুর্গম পাহাড়ি পথ তার উপর জোকের ভয় তবুও সামনে যেতে হবে। ঝরনার সৌন্দর্য আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মূর্তি ঝরনার পানি অনেক গতি নিয়ে উপর থেকে পড়ে, দূর থেকে মনে হয় ঝড় হচ্ছে। ঠাণ্ডা পানির স্পর্শ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তর জুড়িয়ে গিয়েছে।

আমাদের সমতলের বাসিন্দাদের কাছে পাহাড়, ঝরনা সবসময় এক আকর্ষণের নাম। ঝরঝরি ঝরনার প্রতিটি ঝরনাই আমাদের মন কেড়েছে। ঝিরি পথ, উঁচু নিচু পাহাড়, স্বচ্ছ পানির স্রোতধারা এসবের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রথম। দুপুর বারোটায় আমরা পন্থিশীলা বাজারে পৌঁছে যাই। সেখান থেকে ভরদুপুরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার গল্প আরেক অভিজ্ঞতা। 

লেখক: শিক্ষার্থী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/মাহি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন