বর্তমান যুগ ইন্টারনেটের যুগ। মানবসভ্যতা বিকাশে বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কার হলো ইন্টারনেট, যা বিশ্ববিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্হার এক অনন্য মাধ্যম। ইন্টারনেটের কল্যাণে পুরো বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেট ছাড়া এখন এক মুহূর্ত চলা দায়! কিন্তু এই ইন্টারনেট যদি আমাদের জন্য হয়ে ওঠে অনিরাপদ, তাহলে তা বড় মুশকিল। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারে হতে হবে সচেতন, নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার বলতে বোঝায় সাইবার হামলাকারীদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকে সংরক্ষণ করা, হ্যাকারদের থেকে ইমেইল, ফেইসবুক নিরাপদ রাখা, ডিভাইসের সব তথ্য গোপনীয় রেখে প্রয়োজনীয় কনটেন্ট ব্যবহার করা। কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারে সর্বোচ্চ সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে, সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবককে সচেতন থাকতে হবে, এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। কেননা, অপ্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ ইন্টারনেটে নিরাপদ নয়। কাজেই, ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ সুবিধার মাধম্যে শিশুর জন্য অনুপযুক্ত বা আপত্তিকর ওয়েবসাইটগুলো ব্লক করে রাখতে হবে। এছাড়া ‘ইউটিউব কিডস’ নামে ইউটিউবের একটি সংস্করণ আছে শিশুদের জন্য, সেটা ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, স্ক্রিনিং টাইম নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। এতে করে তারা নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ইচ্ছে করলেও ইউটিউব স্ক্রিন করতে পারবে না।
অনিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে সহজেই ব্যক্তিগত তথ্য সাইবার হামলাকারীরা হাতিয়ে নিতে পারে, যার ফলে ব্যবহারকারীকে পড়তে হয় নানা সমস্যায়। শিশু-কিশোররা সহজে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে যেতে পারে। সহজে অনলাইনে জুয়া খেলা, অনলাইন গেইমে (যেমন—পাবজি, ফ্রি ফায়ার ইত্যাদি) আসক্ত হয়ে যেতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে তরুণ সম্প্রদায় বিপথগামী হচ্ছে, মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, মাঠে খেলাধুলা ছেড়ে দিয়ে দিনরাত ইলেকট্রনিক ডিভাইসে পড়ে থাকছে। ইউটিউব, ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ফিফা ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। । এসবের আসক্তিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা-একাকিত্বের অনুভূতিও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফিল রিড বলেন, যেসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের অতিরিক্ত নেশা আছে, তারা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপারেটিং সিস্টেম, ব্রাউজার বা অন্যান্য সফটওয়্যার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপডেট করে নিতে হবে। অনলাইনে ওয়েবসাইট বা অ্যাপে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। মোবাইল নাম্বার, বাসার অ্যাড্রেস এসব দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কম্পিউটার, মুঠোফোনের পাশাপাশি ইমেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ( ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম) শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে—পাসওয়ার্ড হতে হবে ইউনিক। নিজের নাম কিংবা সহজে অনুমান করা যায় এরকম পাসওয়ার্ড ব্যবহার না করাই ভালো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত বা অপরিচিত কারো সঙ্গেই নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কোনো তথ্য (পাসওয়ার্ড, ছবি কিংবা ভিডিও) শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এতে পরবর্তী সময়ে বিপদের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতেচন হতে হবে। অপরিচিত স্থানে ওয়াই-ফাই সংযোগ না দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সাইবার ক্যাফে বা এ ধরনের পাবলিক প্লেসে কাজ শেষে সঙ্গে সঙ্গে লগ আউট করে ফেলতে হবে। প্রয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই মুঠোফোনের ব্লুটুথ ও জিপিএস ফিচার বন্ধ রাখতে হবে। কেননা, এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অবস্থান অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। লটারি বা বিভিন্ন পুরস্কারের প্রলোভনে পাঠানো ইমেইল বা বার্তা খোলা যাবে না। এ ধরনের বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে নানা ধরনের পুরস্কারের প্রলোভন দিয়ে মূলত ব্যবহারকারীর যন্ত্রে ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস পাঠিয়ে সাইবার হামলা চালানো হয়ে থাকে।
তাছাড়া নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বার্থে অবশ্যই কম্পিউটার ও মুঠোফোনে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে। সব সময় অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোর থেকে প্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত। এতে করে নিরাপত্তার দিকটি নিশ্চিত হয়। সর্বোপরি, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতে হতে হবে সচেতন। সচেতন হলেই ভার্চুয়াল জগতের বিপদ, হয়রানি থেকে মুক্তি মিলবে এবং নির্বিঘ্নে ইন্টারনেট-সেবা গ্রহণ করা যাবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
