মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২২ সালের ২৫ জুন ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন। দ্বিতল ঐ সেতুটি ৭২টি পিলারের ওপর দৃশ্যমান রয়েছে। চার লেনের ৭২ ফুট প্রস্থের ঐ সেতুটিতে নিচতলায় রেললাইন ও ওপরের তলায় গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। সেতুটি নির্মাণে মোট ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর পাইলিং ও নদীশাসনের উদ্বোধন করেছিলেন। সেতুটি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হওয়ায় শেখ হাসিনা সরকার সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংক যখন নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছিল, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্ম সেতুটি নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল। শুধু শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের সেতু পদ্মা আলোর মুখ দেখতে পান। সস্প্রতি ঐ সেতুটি উদ্বোধনে বাংলাদেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। মোটা দাগে বলা যেতে পারে যে, ঐ আনন্দ ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে বাংলার আকাশে যে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
পদ্মার এক প্রান্তে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া অপর প্রান্তে শরীয়তপুরের জাজিরা রয়েছে। ঐ সংযোগের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। সেতু নির্মাণে বর্তমানে পদ্মা নদীটি ছয় থেকে সাত মিনিটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আগে ঐ নদীটি পাড়ি দিতে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগত। পদ্মা সেতু নির্মাণে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা ছিল বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন। বর্তমানে পদ্মা সেতু নির্মাণে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের দূরত্বও অনেক কমে গিয়েছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার উৎপাদিত পণ্য সমগ্র বাংলাদেশে অতি সহজেই নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটির বেশি টোল আদায় হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে, বছরে ঐ পদ্মা সেতু থেকে প্রায় ৮০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি টোল আদায় হতে পারে। এই হিসাব অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে পদ্মা সেতু থেকে আনুমানিক ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আয় হতে পারে। যদি এই হিসাব ঠিক থাকে, তাহলে পদ্মার আয় থেকে বাংলাদেশে আরো কিছু সেতু নির্মাণের সম্ভাবনাটিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আশা করা যাচ্ছে যে, সেতুটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।
পদ্মা আমাজনের মতো বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা নদী। সেতুটি নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি দিকনির্দেশনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ৭০০ প্রকৌশলীর দক্ষতা কাজে লাগানো হয়েছে। বর্তমানে নির্মিত স্বপ্নের পদ্মা সেতুটির পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মার জীববৈচিত্র্য ও কৃষির উন্নয়ন নিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সমগ্র বিশ্বে পদ্মার ইলিশ ও অন্যান্য প্রজাতির মাছেরও ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে; যা হোক, পদ্মা তীরের পরিবেশগত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সম্প্রতি পদ্মাকে কেন্দ্র করে ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত জমির মূল্য দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পদ্মা সেতুগামী সড়কের দু্ই ধারেরই পাশে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত শত শত একর ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা ও আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনাটিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভবিষ্যতে পদ্মায় অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি পদ্মার আশে পাশে পরিকল্পিতভাবে পরিবেশ সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতায় নিরাপদ খাদ্য ও পানির অভাব দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনেও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দিনে দিনে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি পরিকল্পনার অভাবে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, তাহলে ‘আমার টাকায় নির্মিত পদ্মার’ ভাবমূর্তি ভবিষ্যতে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। ইতিমধ্যে পদ্মাকে ঘিরে সরকার কর্তৃক শত শত পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। তাছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বহু মানুষের বসবাসও শুরু হয়েছে। যদি অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা ও আবাসন বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য সহ মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন হুমকির দিকে যেতে পারে। ঐ কলকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থে পদ্মার পানি, মাটি ও বায়ু দূষিত হতে পারে। এতে পদ্মার ইলিশসহ অন্যান্য জলজ প্রাণি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদি বিষাক্ত পদার্থ মাছের শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে ঐ বিষাক্ত পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। অন্য দিকে কলকারখানার বিষাক্ত পদার্থ মাটি হতে শস্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। বায়ুমণ্ডলে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতিতেও মানুষ বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত রোগের সম্মুখীন হতে পারে। মোটকথা, ভবিষ্যতে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নে পদ্মার তীরের পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। সেই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী পদ্মার আশপাশে কৃষিভিত্তিক পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিতকে গুরুত্ব দিয়ে বলা যায়, সমন্বিত কৃষি খামার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে। যদি বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণসহ জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ সহজতর হবে বলে আশা করা যায়। পদ্মার তীরে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলার জন্য দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকরীদের সহযোগিতারও প্রয়োজন রয়েছে। ঐ বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতায় দানাজাতীয় শস্য, সবজি, আলু, ডালজাতীয় ফসল ও ফলের চাষাবাদ শুরু করা যেতে পারে। খামারে উৎপাদিত ঐ কৃষি ফসলের কিছু অংশ সরাসরি সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে বাজারজাত করা যেতে পারে। আবার বাকি অংশ প্রক্রিয়াজাতকরণও করা যেতে পারে। যেহেতু এই অঞ্চলে আলুর ব্যাপক চাষাবাদ হয় সেহেতু আলুজাতীয় বিভিন্ন ধরনের খাবারও তৈরি করা যেতে পারে। উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। উল্লেখ্য, কৃষিজাত ফসল বালাইনাশকের প্রয়োগ ছাড়াই উৎপাদিত হবে বিধায় পণ্যের গুণগত মান রক্ষিত হবে। ফসল উৎপাদনে কেমিক্যাল সারের পরিবর্তে মাইক্রেরিয়াল জৈব সারের দিকেও জোর দেওয়া যেতে পারে। খামারে কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন থেকে বাজারজাত করনের প্রতিটি পর্যায়ে গুণমানের দিকে নজর দিতে হবে। সেই লক্ষ্যে খাদ্যের গুণমান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরিও স্থাপন করা যেতে পারে। অন্যদিকে পদ্মার ইলিশেরও বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। পদ্মার কয়েক কিলোমিটার এলাকায় মৎস্য আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করা যেতে পারে। তাছাড়া মৎস্য গবেষণার ওপরও জোর দেওয়া যেতে পারে। পদ্মার মাছ ও কৃষি পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত হবে বিধায় বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশের প্রশংসিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক, পরিবেশও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে পদ্মা বাংলাদেশকে সমগ্র বিশ্বে পরিচয় করে দিতে একটুও কার্পণ্য করবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞানভিত্তিক দর্শন বাস্তবায়নে পদ্মার তীরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর গবেষণা ভিত্তিক ‘পদ্মা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করা যেতে পারে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি, মৎস্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অনুষদ খোলা যেতে পারে। যেখানে ফসল, মাছ ও উৎপাদিত খাদ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি নিয়ে গবেষণা অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উৎপাদিত পণ্যের গুণমান নিয়ন্ত্রণে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিও স্থাপন করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়টি আধুনিক ও বিশ্বের র্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আদলে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষক/গবেষকও নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বিদেশি ছাত্রছাত্রীর কোটাভিত্তিক অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়টি তদারকিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। ফলে পদ্মার তীরে উৎপাদিত পণ্যের গুণমান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দক্ষ গবেষক তৈরি হবে যা সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশকে গবেষণার মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দিতে সামর্থ্য হবে।
পদ্মা আমাদের গৌরব ও অহংকার। ঐ পদ্মায় নির্মিত সেতুটি বাংলাদেশেকে আরেক বার বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে বাঙালি জাতি যেমন গৌরব অর্জন করেছিল ঠিক তেমনিভাবে পদ্মার মাধ্যমে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানচিত্রে নিজেদের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দেশের উন্নয়নে বাংলাদেশের কাছ থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নেতাদেরও শিক্ষণীয় রয়েছে। ঐ শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর একমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ব শেখ হাসিনা পদ্মার মাধ্যমে স্থাপন করেছেন। পরিশেষে মোটা দাগে বলা যেতে পারে যে, ভবিষ্যতে পদ্মার তীরে পরিবেশ ও প্রযুক্তির উন্নয়নে গবেষণা ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মডেলটি সমগ্র বিশ্বে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সালনা, গাজীপুর
