শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাবনা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২২, ০৩:৩৬

বিদ্যুৎ উত্পাদন ও ব্যবস্হাপনা উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৪০০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উত্স থেকে ৭৭ মেগাওয়াট উত্পাদন করা সম্ভব, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ৩ শতাংশের মতো।

সমুদ্র সম্পদ ব্যবহার করে অনায়াসে বিদ্যুৎ উত্পাদন করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক ঢেউ ও জোয়ারের স্রোত ব্যবহার করে ৩৩৭ জিওয়াট (গিগাওয়াট) বিদ্যুৎ উত্পাদন করা হবে। একই সময়ে ৩২০ জিওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদন হবে বায়ুশক্তি ব্যবহার করে এবং ৪০০ জিওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদন হবে সৌরশক্তি ব্যবহার করে। 

বিশ্বব্যাপী বায়ুবিদ্যুৎ উত্পাদন প্রতি বছর ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে এ খাতে অপার সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগের অভাবে সে সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এদিকে প্রাকৃতিক কারণেই বাংলাদেশে সৌরবিদু্যতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এখানে বছরে তিন শ দিনেরও বেশি রোদ থাকে। ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সোলার প্যানেল আনা হয়। বাংলাদেশে সৌরবিদু্যত্ সম্ভাবনাকে বাস্তব করতে ২০০৩ সাল থেকে কাজ করছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে এ খাত যথেষ্ট অব্যবস্হাপনা ও ধীরগতি সম্পন্ন, যার ফলে বিতরণ ব্যবস্হা ব্যাহত হচ্ছে। 

বায়ুবিদ্যুৎ উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্হা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮২ সালে একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেশের ৩০টি আবহাওয়া তথ্য স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা বায়ুর গতি-প্রকৃতি অনুযায়ী ঐ বিদ্যুৎ উত্পাদনের জন্য উপযুক্ত। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উত্পাদনের একটি পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০০৫ সালে ফেনীর মহুরী নদীর তীর ও সোনাগাজী চরাঞ্চল ঘেঁষে খোয়াজের লামছি মৌজায় ৬ একর জমির ওপর স্হাপিত হয় বাংলাদেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হলেও পল্লিবিদ্যুতের একটি ফিডারে যোগ হয়ে তা বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা হলেও মেটাতে ভূমিকা রেখেছে। যদিও ২০০৭ সালে কারিগরি ত্রুটি, অব্যবস্হাপনা ও পর্যাপ্ত বাতাস না থাকায় এর কার্যক্রম বেশ কয়েকবছর বন্ধ ছিল। 

২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে তা পুনরায় চালু হয়। ২০১৪ সালে বিদ্যুৎ উত্পাদন হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ২৪৩৯ ইউনিট। তখন গড় উত্পাদন ছিল প্রতিদিন ১৬৮৩০ ইউনিট। বর্তমানে পিডিবির প্রজেক্টের আওতায় প্যান এশিয়া পাওয়ার সার্ভিস লিমিটেডের মাধ্যমে চারটি টারবাইন দিয়ে বাতাসকে কাজে লাগিয়ে ২২৫ কিলোওয়াট করে ৯০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উত্পন্ন করার ব্যবস্হা করা হয়েছে। এটির সর্বোচ্চ উত্পাদন ক্ষমতা ০.৯০ মেগাওয়াট। 

বাংলাদেশের অন্য আরেকটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায়। ২০০৮ সালের পহেলা বৈশাখে এই কেন্দ্র থেকে উত্পাদিত বিদ্যুৎ ৬০০ গ্রাহকের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিতরণও করা হয়েছিল, যেখানে ছিল ৫০টি টারবাইন। প্রতিটির ক্ষমতা ২০ কিলোওয়াট করে। অর্থাৎ এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উত্পাদন ক্ষমতা ১ মেগাওয়াট। যদিও পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ বিতরণের পর বেশ কয়েকবছর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ ছিল। পরে তা আবার নতুন করে চালু হয়েছে। 

এদিকে বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ুশক্তি থেকে ১৩৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কোনো স্হানে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্হাপনের পূর্বশর্তই হলো সেই স্হানের বায়ু প্রবাহের গতিবিধি ও পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত দীর্ঘ মেয়াদে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। সে লক্ষ্যে উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের নয়টি স্হানে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে ‘উইন্ড রিসোর্স ম্যাপিং প্রকল্প’-এর আওতায় বায়ু প্রবাহের তথ্য-উপাত্ত (ডাটা) সংগ্রহ করা হয়েছে। 

NREL প্রদত্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা বিশেষত খুলনার দাকোপ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং চাঁদপুরের নদী মোহনার এলাকাসমূহে ১০০ মিটার উচ্চতায় বাতাসের গড়বেগ ৬ মি./সে.-এর বেশি যা বায়ুবিদ্যুৎ উত্পাদনে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ঐ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে প্রায় ২০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে যেখানে বাতাসের বেগ ৫.৭৫-৭.৭৫ মি./সে. যার মাধ্যমে প্রায় ৩০,০০০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। যদিও এই পরিসংখ্যান অনেকগুলো নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল, তবু প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে বায়ুবিদ্যুতের প্রসারে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। 

লেখক: শিক্ষার্থী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি