শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিবেশ ধ্বংস যুদ্ধাপরাধের শামিল

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ০৭:২২

ইউক্রেনে রাশিয়ার নৃশংসতার মাত্রা পাখা মেলছে দ্রুতগতিতে। ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে, মৃত্যু ঘটেছে হাজার হাজার মানুষের। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা প্রকাশ করছে, ইউক্রেনের অর্থনীতি যেভাবে বিধ্বস্ত হচ্ছে, তাতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশটির অর্থনীতি ৪৫ শতাংশ সংকুচিত হয়ে পড়বে। রাশিয়ার আগ্রাসনে ব্যাপক হারে অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে দারিদ্র্য, আকালাবস্থা ও মানবস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি চরম পরিণতি ইউক্রেনে একটি মানবিক সংকট তৈরি করেছে। মানবতা ও আর্থসামাজিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত বিপর্যয় ইউক্রেনের বাস্তুতন্ত্রকে চূড়ান্ত কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য বড় মাপের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে।

চলমান যুদ্ধ ইউক্রেনে দুই ধরনের পরিবেশগত ক্ষতি করছে। এর সরাসরি অভিঘাত পড়ছে বাস্তুতন্ত্রের ওপর। জৈব পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে এই যুদ্ধ। তাছাড়া প্রতিকূল প্রভাব ফেলছে মানবস্বাস্হে্যর ওপর। যার ওপর নির্ভর করে আমরা শ্বাস নিই, জল পান করি, খাদ্য খাই—এমন সব পরিষেবার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে চলমান যুদ্ধ।

রাশিয়া অত্যাধুনিক আর্টিলারি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে নির্বিচারে শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করে চলেছে। অয়েল স্টোরেজ ট্যাংকার, তেল শোধনাগার, ড্রিলিং প্ল্যাটফরম, গ্যাসের মজুত, গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন, খনি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইট, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ সেক্টর, বর্জ্য জল শোধনাগার, জল সরবরাহব্যবস্হা, পাম্পিং স্টেশন এবং বিভিন্ন পাইপলাইনসহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের রিপোর্ট বলছে, পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউক্লিয়ার ওয়েস্ট ডিস্পোজাল সাইটসহ বিপজ্জনক ও বিষাক্ত কেমিক্যাল সাইটগুলো। ইউক্রেনে প্রায় ১ হাজার ৯০০ বিষাক্ত সুপারফান্ড সাইট ধ্বংস হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বন্যা ও ভারী বৃষ্টিপাতের পরে এসব বিষাক্ত রাসায়নিক ভূগর্ভস্থ জলে মিশে গিয়ে জলপথে ছড়িয়ে পড়েছে। শত শত শিল্পকারখানা, গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রাবক থেকে শুরু করে অ্যামোনিয়া ও প্লাস্টিকের মতো বিপজ্জনক পদার্থ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। সার ও নাইট্রিক অ্যাসিড প্ল্যান্টসহ কৃষি-শিল্প স্টোরেজ কারখানাগুলোর বিস্ফোরণ থেকে বিভিন্ন বিপজ্জনক পদার্থ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। এজাতীয় বহু রাসায়নিক কারখানায় আক্রমণের পর কমলা রঙের বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডুলি উড়তে দেখা গেছে মাইলের পর মাইল। কারখানার এসব বিষাক্ত গ্যাস মানুষ ও গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। যুদ্ধ সর্বদাই নৈরাজ্যকর এবং যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধাচরণ আসে সব জায়গা থেকেই। যেমন—জেনেভা কনভেনশনের মতো বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কনভেনশন পরিবেশের ওপর এজাতীয় নিষ্ঠুর, স্থায়ী ক্ষতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এ ধরনের কাজকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করে।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক কুয়েতে শত শত তেলের কূপে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং লাখ লাখ গ্যালন তেল পারস্য উপসাগরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় কুয়েতকে ইরাকের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে দেখেছি আমরা। এ ঘটনাকে ভালো চোখে দেখেনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইরাককে প্রায় ৫৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জাতিসংঘের ক্ষতিপূরণ কমিশন, যার একটি অংশ পরিবেশগত এবং মানবস্বাস্থ্য সম্পর্কিত ক্ষতির জন্য ধার্য করা হয়।

তবে সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনগুলো বেশ অস্পষ্ট এবং জাতিসংঘ সেভাবে প্রয়োগও করতে পারে না বা করে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের জন্য ব্যক্তিদের বিচার করে। ইউক্রেনের ঘটনায় মামলা করতে চাইলে রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যেতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে সোভিয়েত যুগে ইউক্রেনে ছড়িয়ে পড়া পূর্বের পরিবেশগত অবক্ষয়কে বর্তমান যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি থেকে আলাদা করা কঠিন হবে।

ভবিষ্যতে প্রসিকিউশনকে গাইড করবে এমন আইনি নীতিগুলো আরো ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য জাতিসংঘে কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক আইন কমিশন নামে জাতিসংঘের একটি বিভাগ ২৮টি অস্পষ্ট নীতির একটি সেট তৈরি করেছে। পরিবেশ ধ্বংসের প্রবণতা কমাতে আক্রমণকারী কিংবা দখলদার উভয় বাহিনীর দ্বন্দ্ব-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইনকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের প্রতিবেদনে সশস্ত্র সংঘাতের কারণে পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ইউক্রেনের অবকাঠামো এবং পরিবেশ ধ্বংস করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার স্পষ্ট দোষের কথা বলছেন অনেকেই। উদাহরণস্বরূপ, সুরক্ষিত অঞ্চলের খসড়া নীতি ১৭ মতে, ‘একটি সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ববহ কোনো এলাকাকে যেকোনো আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত করা হবে, যতক্ষণ না এতে সামরিক উদ্দেশ্য না থাকে।’

এ ধরনের যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে ২১ এপ্রিল ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ থেকে ইউক্রেনকে পুনরুদ্ধারের জন্য একটি জাতীয় কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন। এই কাউন্সিলে পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর গ্রুপ গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন পরিবেশমন্ত্রী রুসলান স্ট্রিলেটস। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পরিবেশগত নিরাপত্তা গ্রুপটি দখলদার রাশিয়ান বাহিনীর পরিবেশগত অপরাধের যাবতীয় মামলা রেকর্ড করছে। এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক আদালতে ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণ চাওয়া।

২০১৪ সালে রাশিয়া যখন দনবাস অঞ্চলে আক্রমণ করে, তখন সেই অঞ্চল কয়লা খনন ও শিল্পাঞ্চলের কেন্দ্র ছিল। সে সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রশাসন বহু কয়লাখনি বন্ধ করে দেয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিপাতের ফলে অনেক খনি প্লাবিত হয় এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বৃদ্ধির ফলে নদীগুলোতে খনির অম্লীয় জল উপচে পড়ে। আমরা জানি, অ্যাসিড খনি নিষ্কাশন জলজ বাস্ত্ততন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকিগুলোর একটি। খনি নিষ্কাশন জলের ক্রমাগত পাম্পিং এবং অম্লীয় জল লম্বা সময় ধরে নদী, স্রোত ও জলজ জীবনকে ধ্বংস করতে পারে। বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত খনির বর্জ্য জল ইউক্রেনের নদীগুলোতে গিয়ে পড়ছে। আজভস্টাল স্টিল প্ল্যান্ট মারিউপোলের আজোভ সাগরের নিকটবর্তী উপকূলীয় বাস্ত্ততন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করেছে। মারিউপোলে অবরোধ শুরু হয়েছিল ২ মার্চ। সেই সময়ে আজভস্টাল প্ল্যান্টটিতে নির্দয়ভাবে বোমাবর্ষণ করা হয়। রাসায়নিক স্টোরেজ, বর্জ্য নিষ্কাশনের প্ল্যান্টসহ সমস্ত স্থল অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়। তখন বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো সাইটগুলো থেকে ভূগর্ভস্থ জল ও আজভ সাগরে ছড়িয়ে পড়ে।

লৌহ আকরিক প্রক্রিয়াকরণের ফলে গলিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জে্যর সঞ্চয় ও স্হানান্তর প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তা পরিবেশগত বিপদ ডেকে আনে। মানবস্বাস্হে্যর ঝুঁকি বাড়ে। ইউক্রেনে বিষাক্ত বর্জ্য নিষ্কাশন এলাকাগুলো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পরিবেশগত ঝুঁকিকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। ১৮ মে মারিউপোল সিটি কাউন্সিল বলে, আজভস্টাল প্ল্যান্টের একটি বর্জ্য স্টোরেজ প্ল্যান্ট ফুটো হয়ে হাজার হাজার টন ঘনীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড দ্রবণ আশপাশের জলে মিশতে পারে। এতে করে আজভ সাগরে একটি পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।

২৪ ফেব্রুয়ারি যখন ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ শুরু হয়, তখন আজভস্টালে আঘাত হানার সম্ভাব্যতা বিচার করে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোক ওভেনের ব্যাটারি ও ব্লাস্ট ফার্নেস বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে বাসিন্দারা বিপদে পড়েনি যদিও, তবে বেশির ভাগ বাসিন্দা পরবর্তী বোমা হামলা থেকে বাঁচতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

১৯৪১ সালের ১৮ আগস্ট একটি বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটেছিল, যা অনেকের কাছেই অজানা। ইউক্রেনীয় শহর জাপোরিঝিয়ায় অবস্হিত ডিনিপ্রো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রেড আর্মি ধ্বংস করে দিয়েছিল। অনুমান করা হয়, পরবর্তী সময়ে প্রায় ১ লাখ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। অভিযোগ আছে, তাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। নুরেমবার্গের বিচারে সেই বাঁধের ধ্বংস ছিল তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধের একটি। এ ঘটনায় জার্মানদের জড়িত করা হয়, যদিও দায়ী আসলে সোভিয়েতরা। রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহির ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে কলঙ্কিত করার জন্য এ ধরনের নির্লজ্জ মিথ্যাচারে সমর্থন দিতে পারে না বিশ্ব।

লেখক : ইউনেসকো ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের ভিজিটিং স্কলার এবং জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজের লেকচারার

ফরেন পলিসি থেকে ভাষান্তর : সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

গণপরিবহন নৈরাজ্য ও বর্তমান বাস্তবতা

মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সুশিক্ষাই একমাত্র উপায়

এই আচরণের ব্যত্যয় ঘটাইতে হইবে

জ্বালানি ব্যবহারের ভিত্তিতে পরিবহনের জরিপ প্রয়োজন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নিরাপদ হোক নারীর বৈদেশিক কর্মস্থান 

টিকিয়া থাকিতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি

আসন্ন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

জীবনের অনুষঙ্গ পৃথিবীর পানিসম্ভার