বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ২ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ ক্রমেই পুতিনের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২২, ০১:১৮

রুশ সেনাদের দখলে থাকা এলাকাগুলোতে ইউক্রেনের প্রতিরোধ বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, কিয়েভের আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা ক্রমশ হুমকি হয়ে উঠছে ক্রেমলিন বাহিনীর জন্য। সম্মুখসারির যোদ্ধাদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকরাও।

ফিল্ড ক্যাপ, সানগ্লাস ও নাক-মুখে স্কার্ফ পরিহিত একজন যোদ্ধাকে ভিডিও চিত্রে বলতে দেখা গেছে—‘আমরা ভবন দখল করব, রাস্তা এবং সেতুতে লড়াই করব। আমরা আমাদের ভূমির একটি অংশও ছেড়ে দেব না।’ দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ঐ যোদ্ধা ও তার সহযোগীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ‘দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জড়িত সবাই আমাদের মৃত্যুর তালিকায় রয়েছে।’

জুলাইয়ের শুরুতে ভিডিওটি রেকর্ড করে টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইউক্রেনের যোদ্ধারা যে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মরিয়া, ভিডিওটি থেকে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যদিও প্রকাশিত ভিডিওতে কথা বলা নাম-ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ যোদ্ধাকে উদ্দেশ্য করে দখলদার রুশ বাহিনী পালটা বার্তা পাঠিয়েছে। পাঠানো বার্তায় তারা বলেছে—‘আমরা জানি আপনি কে এবং কোথায় আছেন, আপনি কখনই নিরাপদ হতে পারবেন না।’

রাশিয়ান-অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে, বিশেষ করে ২ লাখ ৮০ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত দীনিপ্রো নদীর তীরবর্তী প্রাদেশিক রাজধানী খেরসনে ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৮ জুন কারাগার-প্রধান ওপর বিস্ফোরক হামলা করা হয়। এতে আহত হন তিনি রাশিয়ার নিযুক্ত এই কর্মকতা। এর চার দিন পর একটি গাড়ি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। আঞ্চলিক প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ সদস্যকে হত্যা করে ইউক্রেন যোদ্ধারা। এর ঠিক ১০ দিন আগে এই অঞ্চলের রুশপন্থি প্রশাসনের প্রধানের গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, যদিও তা ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরেকটি হামলায় অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন ঐ প্রশাসন প্রধান।

ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার দখলকৃত অংশে হত্যা করা হয় একজন রুশ কর্মকর্তাকে। এছাড়া রাশিয়ার দখলকৃত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলিতেও বহু হামলা হয়েছে। জুনের প্রথম দিকে উড়িয়ে দেওয়া হয় টোকমাক এবং মেলিটোপোলের একটি রেলপথ সেতু।

এই ধরনের বেশির ভাগ অপারেশন মূলত গোপন থাকে। তবে ইউক্রেনের বেশ কিছু এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাশিয়ান বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে ইউক্রেনের সেনারা শক্ত প্রতিরোধ গড়তে বেশ সক্রিয় রয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিনের সৈন্যদের প্রতিরোধব্যবস্থাকে ভেদ করতে মরিয়া তারা। দখলদারদের জন্য পরিস্থিতি এখন অনেকটাই হুমকি হয়ে উঠছে। রুশ সেনারা যে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন, তা বোঝা গেছে ইতিমধ্যেই। সম্প্রতি আমেরিকান হিমারস দিয়ে আঘাত হানছে ইউক্রেনীয় যোদ্ধারা। ৮০ কিলোমিটার (প্রায় ৫০ মাইল) পরিসীমাব্যাপী আঘাত হানতে সক্ষম হিমারস এবং রকেট লঞ্চারসহ নানা পশ্চিমা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে ইউক্রেন যোদ্ধারা। এসবের মাধ্যমে রুশ-অধিকৃত এলাকার গভীরে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করতে সক্ষম হচ্ছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। সাম্প্রতিক দিনগুলিতে রাশিয়ান গোলাবারুদ ও জ্বালানি ডিপো ধ্বংস বেড়েছে। কমান্ড সেন্টারগুলির আগুনে পোড়ার খবরের সংখ্যা বাড়ছে। এগুলি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কিয়েভে ইউক্রেনের যোদ্ধাদের প্রতিরোধ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাস্তবিক অর্থে নিজস্ব জনগণের ‘সামরিক মূল্য’ উপলব্ধি করতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের। এটি ভলোদিমির জেমচুগভের চেয়ে কেউ ভালো উপলব্ধি করতে পারবে না। ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ সংগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত সদস্য ৫১ বছর বয়সি এই ইউক্রেনের নাগরিক। জেমচুগভ লুহানস্ক অঞ্চলের ক্রুস্টালনি গ্রামের বাসিন্দা। আট বছর আগে রাশিয়ান দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে দনবাস প্রদেশে যখন মস্কো-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দখল শুরু করে; এবং পরবর্তী সময়ে রুশ সৈন্যরা যুক্ত হলে দখল-হামলায় বাড়াতে থাকে, তখন তিনি একটি প্যাকেজিং কোম্পানি চালাতেন। বাস করতেন জর্জিয়ায়। কিন্তু যখন তিনি কোনো একটি কাজে নিজ দেশে ফিরে আসেন, তখন তিনি দেখতে পান এক ভয়াবহ চিত্র। এক কঠিন-মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে পান চোখের সামনে। তিনি দেখেন, শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দখলদার গোষ্ঠী তার বন্ধুদের হত্যা করা হয়েছে। বহু ইউক্রেনীয়কে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, ইউক্রেনীয় সৈন্যদের মৃতদেহ দাফনে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

জেমচুগভ বলেন, ‘আমার মায়ের ভয় ছিল এই ভেবে যে, আমি কিছু একটা করতে চলেছি।’ খনিশ্রমিক, ব্যবস্থাপক, ডাক্তার এবং শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি প্রতিরোধ ইউনিট গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন জেমচুগভ। একটি সাক্ষাতকারে জেমচুগভ বলেন, ‘সে সময় কেউ সিরিয়াসলি নেয়নি আমাদেরকে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছে আমরা ছিলাম “শুধুই সন্ত্রাসী”।’ তিনি যোগ করেন—‘এখন সবাই হঠাৎ আমাদের প্রতি আগ্রহী।’

নিজের টাকা থেকে ১০ হাজার ডলার নিয়ে বন্ধুদের একত্রিত করে একটি ছোট দল দিয়ে শুরু করেছিলেন জেমচুগভ। তার গড়া ইউনিটটি প্রথমে শত্রু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। তার ভাষায়—‘এটা ভেবে হাসি পায় যে, আমরা রাশিয়ান সৈন্যদের বিয়ার ও সিগারেট এনে খেয়েছি।’ দুর্নীতিবাজ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অস্ত্র কিনে নেয় জেমচুগভের বাহিনী। দলটি বহু সামরিক শিবির ও সৈন্যদের আক্রমণ করে, যারা পাব বা সনাসের মতো জায়গায় লুকিয়ে ছিল। তারা রেলের ট্র্যাক, ট্রান্সমিশন টাওয়ার, পাওয়ার লাইন এবং বেশ কয়েকটি এলাকার মধ্য দিয়ে চলমান একটি গ্যাস পাইপলাইন উড়িয়ে দেয়।

ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে বেশ কিছু পরিমাণে বিস্ফোরক সংগ্রহ করেছিল জেমচুগভরা। জেমচুগভ বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় বোমা বানাতে জানতাম।’ তিনি এবং তার সহযোদ্ধারা আট মাস পর্যন্ত ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর না করে এইভাবে ‘এজেন্ট’ হয়ে আক্রমণ চালিয়ে যান সে সময়।

তার ভাষায়—২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের আগ পর্যন্ত ৩০টি সফল অভিযান সম্পাদন করেছিল তার বাহিনী। শেষ অপারশনের সময় একটি মাইনের তারে পা আটকে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত হন তিনি। রাশিয়ান সৈন্যরা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখতে পায়। তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তার দুটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছিল। প্রায় এক বছর তাকে বন্দি করে রাখা হয়। বহু জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয় তার ওপর। বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তৎকালীন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেট্রো পোরোশেঙ্কো তাকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেন—‘হিরো অব ইউক্রেন’।

জেমচুগভ তার পর থেকে কৃত্রিম যন্ত্রের সহায়তায় জীবন ধারণ করছেন। ডাক্তাররা পরে এক চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে এবং তার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে শ্রাপনেল অপসারণ করতে সফল হন। এখন তিনি তার স্মার্টফোনে নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন। ইতিমধ্যে তিনি রেসিসটেন্স মুভমেন্ট হ্যাশট্যাগ যুক্ত করে ইউটিউব চ্যানেল চালু করেছেন। ইউক্রেনীয় মিলিটারি টেলিভিশন চ্যানেলে একটি ইউটিউব সম্প্রচারে তিনি ব্যাখ্যা করছেন যুদ্ধের নানা কলাকৌশল। উদাহরণস্বরূপ, কীভাবে রাশিয়ান বাহিনীর লক্ষ্যভেদ করে আক্রমণ করা যায়। কীভাবে আক্রমণ থেকে বাঁচা যায়। বেশ কিছু নিয়মনীতিও তিনি বাতলে দিচ্ছেন ইউক্রেনীয় বাহিনীকে—‘অস্পষ্ট পোশাক পরুন এবং সর্বদা শান্ত থাকুন, যা-ই হোক না কেন লড়াই চালিয়ে যান।’

চলমান যুদ্ধের এই সময়ে দখলদাররা বেশ সচেতন এই ভেবে যে, ইউক্রেনের প্রতিরোধ বেড়েছে। খেরসনে তারা এখন তাই ইউক্রেনের যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান হারে নৃশংস সব পদক্ষেপ নিচ্ছে। জুলাইয়ের শুরুতে শহরের কেন্দ্রে তাদের কমান্ড সেন্টারে চালানো একটি বিমান হামলার পর থেকে চেকপয়েন্টগুলিকে শক্তিশালী করেছে তারা। নজরদারি আরো জোরদার করেছে।

মূলত দখলদার এবং ইএক্রন যোদ্ধা উভয়ের জন্যই এখনকার সময় অনেক বেশি বিপজ্জনক। নাগরিকরা প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নির্দেশে আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। বহু লোক যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ খাবারের মজুত বাড়াচ্ছে। মোলোটভ ককটেল মিশ্রিত করছে অনেকে। বোমা তৈরি করছে কেউ কেউ। ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের এক সদস্যের ভাষায়—‘আমরা যদি আমাদের দেশে স্বাধীনতায় বাঁচতে চাই, তবে আমাদের এছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’

লেখকদ্বয় : সাংবাদিক 
স্পিগেল ইন্টারন্যাশনাল থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/ইআ