বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ২ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা 

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ০৩:০৯

‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বেলায়ও এই অমোঘ বাংলা প্রবাদটা খেটে যায়। এ যুদ্ধের দুর্ভোগ ঐ দুটি দেশের জনগণের গণ্ডি ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে। যুদ্ধের খড়গ নেমে এসেছে বিশ্বের কোটি কোটি নিরীহ মানুষের ওপর। চলমান এর যুদ্ধ থামার এখন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ নেই। যুদ্ধের এই পাঁচ মাসে বিশ্ব অনেক কিছুই দেখেছে—তেল ও গ্যাসের রেকর্ড দাম, ডলারের অতি মূল্যায়ন ও স্থানীয় মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়নের ফলে দেশে দেশে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি প্রভৃতি। এ যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা। চরম সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি।

খাদ্যনিরাপত্তা হলো খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা। অর্থাৎ কারো হাতে টাকা থাকলে সে খুব সহজে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারবে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যের মজুত ও তার সহজলভ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তাই হলো খাদ্য নিরাপত্তা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে এই খাদ্যনিরাপত্তা ইতিমধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দুটি বড় জোগানদাতা। ইউক্রেনকে বলা হয় ইউরোপের রুটির ঝুড়ি। গম উৎপাদনে ইউক্রেন বিশ্বের পঞ্চম। বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা গমের ৩০ শতাংশই জোগান দেয় ইউক্রেন ও রাশিয়া। এছাড়াও সানফ্লাওয়ার অয়েল, ভুট্টা, বার্লি প্রভৃতি খাদ্যশস্য বিশ্ববাজারে বড় আকারে সরবরাহ করে এই দুটি দেশ। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক গরিব ও উন্নয়নশীল দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের এসব খাদ্যশস্যের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। বর্তমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বে এই দুটি দেশের খাদ্যশস্য রপ্তানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন বন্দর দখল এবং কৃষ্ণসাগরে পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। হুমকিতে পড়েছে বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তা।

ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইনস্ কাউন্সিল (আইজিসি) বলছে, ২০২২-২০২৩ সালে বৈশ্বিক খাদ্যোত্পাদন কমে যাবে, মজুতও গত আট নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হবে। বিশ্বে খাদ্যোত্পাদন যে কমে যাবে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আর এর পেছনে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ। প্রত্যক্ষ কারণ হলো—যুদ্ধের কারণে দেশ দুটির খাদ্যশস্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গুদামে খাদ্যশস্য পচে যাচ্ছে এবং পচে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে যুদ্ধরত দেশ দুটির চাষিরা স্বাভাবিকভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে নিরুত্সাহিত হবে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাবে। অন্যদিকে রাশিয়া বিশ্বের তৃতীয় জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারী দেশ এবং বিশ্বে গ্যাস রপ্তানিতে অন্যতম। রাশিয়া ইউরোপের গ্যাসের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশের জোগানদাতা। আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ইউরোপে তাদের জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম। ফলে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিকারক বিভিন্ন দেশের সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার—খরচ বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে ঐসব দেশে খাদ্যোত্পাদন হ্রাসে ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা-ডব্লিউএফপি বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এতবড় খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হয়নি বিশ্ব। সামনে খারাপ সময় অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করছে সংস্থাটি। ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি আরো প্রকট হলে আমদানি-নির্ভর দেশগুলো বেকায়দায় পড়বে। এমতাবস্থায়, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করারটা অতি জরুরি। বিশ্ববাসীর খাদ্যচাহিদা পূরণে বিশ্ব নেতারা যুদ্ধ বন্ধসহ খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই প্রত্যাশা করি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ