শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৃষ্টিহীন বর্ষা ও আমন ফসলে মৌসুমি সংকট

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ০৩:২২

কৃষি পঞ্জিকায় কৃষিকে তিনটি মৌসুমে ভাগ করা হয়, যেমন—আউস, আমন ও বোর। বর্তমানে আমন মৌসুম চলছে এবং এই সময়ে আমন ধান বাংলাদেশের কোনো কোনো এলাকায় প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত। বিশেষত সমতল ভূমিতে চাষ হওয়া ধান, যার মধ্যে স্থানীয় ও উচ্চফলনশীল ধানও রয়েছে। 

প্রকৃতিগতভাবেই এটা বর্ষাকালীন ধান, যা সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয় বৃষ্টির পানির ওপর, যদিও যেখানে উফশী ধান চাষ হয় স্কিমের মাধ্যমে, সেখানে সেচের ব্যবস্হা থাকে। কিন্তু এ বছর বৃষ্টিহীন বর্ষায় দেশের আমন আবাদ সংকটের মুখে পড়েছে। অন্যান্য বছর এ সময় পুরোদমে আমনের আবাদ চলে; কিন্তু এ বছর আমনের আবাদ দূরের কথা, বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়নি। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিহীন তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি খাত। আষাঢ় গিয়ে শ্রাবণ চললেও দেশের কোনো অঞ্চলেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের দেখা নেই। বৃষ্টি না হওয়ায় পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে কৃষকদের মধ্যে। পানির অভাবে কৃষকেরা বীজতলা তৈরি করতে পারছেন না। অনেকে কৃত্রিমভাবে পানির ব্যবস্হা করে বীজতলা প্রস্তুত করলেও চারা রোপণ করতে পারছেন না। ফলে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বৃষ্টির অভাবে আমনের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও কৃষক সেচ দিয়ে আমনের চারা রোপণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু খরচ বেশি হওয়ার ভয়ে বেশির ভাগ কৃষকই আমন আবাদ থেকে দূরে রয়েছেন, যদিও কৃষি বিভাগ সেচ দিয়ে আমন আবাদে কৃষকদের উত্সাহিত করার চেষ্টা করছে। ফলে এই অস্থির আবহাওয়ায় এ বছর আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জন করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ৫৯ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ করা সম্ভব হয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার চার ভাগের এক ভাগ জমিতে আমনের চাষ হয়েছে। তবে এ নিয়ে এখনই হতাশ নয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তাদের মতে, রোপা আমনের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমন রোপণ করা যায়।

কৃষি বিভাগ বলছে, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় এবার ২৫ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে অনাবৃষ্টির কারণে আবাদ হয়েছে মাত্র ১ লাখ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪ শতাংশ। তা-ও আবাদ করতে হয়েছে সম্পূরক সেচ দিয়ে। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জমিগুলোও যদি সম্পূরক সেচ দিয়ে আবাদ করতে হয়, তাহলে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে কমপক্ষে ১ হাজার কোটি টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃষি বিভাগ লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে সম্পূরক সেচ দিয়ে আমন রোপণের পরামর্শ দিচ্ছে। এসব এলাকার কৃষক পানির অভাবে জমিতে আমন চাষ করতে পারছেন না। কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করলেও পানির অভাবে কৃষক জমিতে আমনের চারা রোপণ করতে পারছেন না। আবার তৈরি করা বীজতলার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। অনেক বীজতলা পানির অভাবে হলুদ হয়ে গেছে। সামান্য যেসব জায়গায় সম্পূরক সেচ দিয়ে আমনের চারা লাগানো হয়েছেন, তা-ও পানির অভাবে মরে যাচ্ছে, রোদে পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে। অনেক কৃষক জমিতে হাল দিয়ে রেখেছেন, কিন্তু চারা লাগাতে পারছেন না। অনেকে এখনো জমিতে হালই দিতে পারেননি। সামর্থ্যবান কিছু কৃষক শ্যালো ও বিদ্যুচ্চালিত মোটর দিয়ে আমন লাগানো শুরু করলেও তারা খরচে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। অন্যদিকে প্রান্তিক, বর্গা, বন্দকি ও ক্ষুদ্র চাষিরা এখনো চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে চেয়ে আছেন। ফলে আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্তসহ চারা রোপণ ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমন চাষে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড বলছে, দেশের উত্তরাঞ্চলে গত বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ১৩৭ মিলিমিটার, দ্বিতীয় সপ্তাহে ৩৫ মিলিমিটার ও তৃতীয় সপ্তাহে ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এবার জুলাই মাসে এত কম বৃষ্টি হয়েছে যে, তা রেকর্ডই করা যায়নি। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বর্ষা মৌসুমের এই সময়ে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়, এবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ তার থেকে ৬০ শতাংশ কম। ফলে রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড় জেলায় ভয়াবহ খরার কারণে পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।

শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরাও শঙ্কায় রয়েছেন যথেষ্ট বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমন চাষ নিয়ে। খুলনা অঞ্চলের অধিভুক্ত চার জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৫ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ হেক্টর। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই অঞ্চলে রোপা আমন (হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের) বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ১৭ হাজার ৩৫২ হেক্টর। ২৫ জুলাই পর্যন্ত এই লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক পূরণ হয়েছে মাত্র। অথচ গত অর্থবছরের এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বীজতলা হয়েছিল। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে এই অঞ্চলে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৯৯ হাজার ১১০ হেক্টর। ২৫ জুলাই পর্যন্ত আবাদ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৬২৮ হেক্টর, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি। গত বছর এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ আবাদ হয়েছিল। আবহাওয়াবিদেরাও উদ্বিগ্ন এবার আবহাওয়ার বৈরিতা নিয়ে। দেশে মূলত বর্ষাকালে, অর্থাৎ জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে বেশি বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১ সালের জুলাই মাসে খুলনা অঞ্চলে যেখানে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল প্রায় ৩৫৬ মিলিমিটার, সেখানে চলতি বছরের জুলাই মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১০০ মিলিমিটারেরও কম।

বৃষ্টির পানির বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক মোটর, শ্যালো মেশিন, বিএডিসি সেচ প্রকল্প, গভীর নলকূপ ও বরেন্দ্র সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে আমন রোপণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে এক বিঘায় ধান রোপণে খরচ হয় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। আর এখন সেই জমিতে কৃষকের খরচ পড়ছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গত বছরের তুলনায় লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কম হয়েছে। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষকদের আমরা সম্পূরক সেচ দিয়ে বীজতলা প্রস্ত্ততের জন্য পরামর্শ দিয়েছি। যেহেতু এখনো বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে, তাই বীজতলা প্রস্ত্তত থাকলে আর পরিমিত বর্ষার দেখা মিললে আশা করি আমন চাষে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হব।’

বৃষ্টির পানির বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক মোটর, শ্যালো মেশিন, বিএডিসি সেচ প্রকল্প, গভীর নলকূপ ও বরেন্দ্র সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে আমন রোপণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অবস্থাসম্পন্ন কৃষকেরা শ্যালোসহ গভীর-অগভীর নলকূপের সেচে আমন লাগানো শুরু করেছেন। এক একর জমিতে সেচ দিতে ঘণ্টায় ১৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। শুধু জমি ভিজিয়ে নিতে প্রায় আট ঘণ্টা লাগছে। এরপর চারা লাগানোর পর চারা জীবন্ত রাখতে কয়েক দিন পর আবার পানি নিতে হবে। এতে চারা লাগানো এবং পরের সেচ দিতে প্রায় এক একর জমিতে টাকা লাগবে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মতো। এটা কৃষকদের বাড়তি খরচ। এভাবে সারা দেশে কৃষক যদি সম্পূরক সেচে আমন চাষ করেন, তাহলে তাঁদের কমপক্ষে ১ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে।

এ কথা সত্য, চাষিদের জন্য সরকার কয়েক ডজন প্রকল্প তৈরি করেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে এবং কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, সহায়ক মূল্যে ফসল কিনে নেওয়াসহ কৃষি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সরকার যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমান বছরের বাজেটে সরকার কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি প্যাকেজ হিসেবে বরাদ্দ ১৬ হাজার কোটি টাকার একটু বেশি, যা মোট ভর্তুকির এক-পঞ্চমাংশ । স্মর্তব্য, কৃষি ও আনুষঙ্গিক খাতে বরাদ্দ যেমন—বন, পরিবেশ, গবাদিপশুতে ভর্তুকি এসব খাতের বাজেট বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ। আবার বাজেটে কৃষি খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ রাখা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও সরকার চাষিদের বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এত কিছু সত্ত্বেও চাষিদের একটা বড় অংশই চাষ ছেড়ে দিতে পারলে যেন বেঁচে যায়। আজ প্রযুক্তির বহু উন্নতি হয়েছে, চাষির কাছে নানা প্রযুক্তি ও সুবিধা সরকার পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু চাষিকে আত্মনির্ভর হতে দেওয়া হয়নি। তার কারণ প্রাকৃতিক কারণে কৃষি ও কৃষক বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছেন, যার প্রমাণ এবারের আমন ফসলে খরার আক্রমণ, যা প্রকৃতিগত। এর মোকাবিলা করার জন্য সরকার বাজেটের ভর্তুকি থেকে কৃষকদের সহায়তা করতে পারে।

অতএব, খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে মৌসুমি ফসল আমন ধান রক্ষা করতে হবে এবং এই খরা মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে বিশেষত সেচের পানির জোগানে। এ কথা মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ মাথায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি চাহিদা সম্প্রসারণমূলক সেবাগুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীভূতকরণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের চাল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে, যা কিনা আমাদের সীমিত জমির উর্বরশক্তি বৃদ্ধি, বৃহৎ পরিসরে খাদ্য উৎপাদন এবং যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যায়, একই সঙ্গে ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের খাদ্য-পুষ্টির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষিতে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন প্রবর্তন করতে সক্ষম হতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

গণপরিবহন নৈরাজ্য ও বর্তমান বাস্তবতা

মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সুশিক্ষাই একমাত্র উপায়

এই আচরণের ব্যত্যয় ঘটাইতে হইবে

জ্বালানি ব্যবহারের ভিত্তিতে পরিবহনের জরিপ প্রয়োজন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নিরাপদ হোক নারীর বৈদেশিক কর্মস্থান 

টিকিয়া থাকিতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি

আসন্ন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

জীবনের অনুষঙ্গ পৃথিবীর পানিসম্ভার