শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প ভাবতে হবে 

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২, ০২:২০

কোভিড-পরবর্তী সৃষ্ট মম্হর অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি রপ্তানিতে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ| এর ফলে পৃথিবী জুড়ে জ্বালানির নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে| এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী আমদানিনির্ভর তথা উন্নয়নশীল দেশগুলো| বলাই যায়, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জ্বালানি সংকট| পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকটের দুষ্ট চক্রে খাবি খাচ্ছে| বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়| এই বেহাল পরিস্থিতির উত্তরণে তথা জ্বালানি চাহিদা পূরণে বিকল্প বিষয় ভাবা সময়ের দাবি| একটি দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি| আধুনিক সভ্যতার বিকাশ সাধন ও অগ্রগতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির অবদান অনস্বীকার্য|

কলকারখানা, যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে বর্তমান বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রতুলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে| মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব দেশেই জীবাশ্ম জ্বালানি পাওয়া যায় না| যেসব দেশে জীবাশ্ম জ্বালানি পাওয়া যায় অন্যান্য দেশও সেসব দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে| মূলত একটি দেশের অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তি হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানি কাজ করে থাকে| এক্ষেত্রে প্রধান প্রধান জীবাশ্ম জ্বালানি গুলোর মধ্যে রয়েছে কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল, কয়লা অতি পরিচিত জ্বালানি|

কয়লা পুড়িয়ে সরাসরি তাপ পাওয়া যায়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়| এছাড়া কয়লা থেকে অনেক প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন কোলগ্যাস, আলকাতরা, বেনজিন, অ্যামোনিয়া ও টলুয়িন পাওয়া যায় যা বহুবিধ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়| আবার প্রাকৃতিক গ্যাসও জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে একটি অতি পরিচিত নাম| অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ব্যাপক| জীবাশ্ম জ্বালানির এই অন্যতম উপাদানটি প্রধানত রান্নার কাজে ও যানবাহন, শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হয়| তাছাড়া বাংলাদেশে মোট যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে হয়ে থাকে| বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা নিত্য বেড়েই চলেছে|

জীবাশ্ম জ্বালানির আরো একটি রূপ হচ্ছে খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম| পেট্রোলিয়াম থেকে নিষ্কাশিত পেট্রোল জ্বালানি ক্ষেত্রে এবং পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বহুবিধ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়| প্রথম বিশ্ব থেকে শুরু করে চতুর্থ বিশ্বের সবগুলো দেশই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল| প্রথম বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি| এক্ষেত্রে চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রথম বিশ্বের দেশগুলো বিকল্প ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে| সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় বিদ্যমান ভয়াবহ জ্বালানি সংকট অনেকটাই ইঙ্গিত দেয় যে, জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রতুলতা একটি দেশের অর্থনীতিকে কতখানি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে! বাংলাদেশেও অতি সম্প্রতি সব ধরনের জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি একটি অভ্যন্তরীণ সংকটের সৃষ্টি করেছে| বিশ্ব বাজারে জ্বালানির মূল্য কমলেও দেশে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়|

অপরদিকে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি হওয়ায় একটি বড় ধরনের সামঞ্জস্যহীনতা দেখা দিচ্ছে| ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে একদিকে জনগণের মধ্যে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে, অপরদিকে কলকারখানায় প্রয়োজনীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে| তাছাড়া দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ উত্পাদন কেন্দ্রের কয়লা ঘাটতিজনিত কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে| এরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দেশের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেবে; কেননা বড়পুকুড়িয়া তাপ বিদু্যত্কেন্দ্র থেকে উত্তরাঞ্চলের সিংহভাগ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা হয়| বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানির বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে| বাস্তবে আমরা দেখছিও তা-ই| এই পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট কাটিয়ে ওঠার বিকল্প হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুতশক্তির কথা বলেছেন|

জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে উৎপাদিত বিদ্যুতের উৎস হতে পারে সৌরশক্তি, বায়ুপ্রবাহ এবং প্রবহমান পানির স্রোত| পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশ ইতিমধ্যেই এসব বিকল্প কাজে লাগিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশেই কমিয়ে এনেছে| সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরিকৃত সোলার প্যানেল ব্যবহার করে দেশের একটি বৃহত জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে| বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ার কারণে নদীর প্রবাহ ও স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিধি আরো সম্প্রসারণ করা যেতে পারে| এতে করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে| আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৫০০০ মেগাওয়াট| কিন্তু আমরা মাত্র ১২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি এবং প্রায় ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে| এমতাবস্থায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিজস্ব প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও সক্ষমতা বাড়ানো উচিত|

সর্বোপরি, বর্ণিত পরিপ্রেক্ষিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে আমাদের অভ্যন্তরীণ উত্স্যসমূহের যথাযথ ব্যবহারের দিকে আরো মনোযোগ দেওয়া দরকার| পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ ক্ষেত্রে এবং সমুদ্রের তলদেশে তেল, গ্যাসের খনির অনুসন্ধান করা উচিত| যেহেতু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় তাই এর বিকল্প ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে আনা নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত|

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন