শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিরাপদ হোক নারীর বৈদেশিক কর্মস্থান 

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২, ০৮:১৫

দেশে নারীদের কর্মসংস্থানের হার আগের তুলনায় বেড়েছে। নারীরা এখন অনেক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী। কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প, কুটির শিল্প, মৎস্য শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রভৃতি সেক্টর ছাড়িয়ে নারীর কর্মসংস্থানের বাজার গড়িয়েছে এখন বিদেশের মাটিতেও। তবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নানা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছে নারীরা। বিশেষ করে, বৈদেশিক কর্মস্থানের সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে নারীদের পড়তে হয় বেশ ভোগান্তিতে। কখনো কখনো তা ডেকে আনে চরম সর্বনাশ। নিজেদের অসচেতনামূলক সিদ্ধান্তের ফলে আবার কখনো পাচার সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে নারী জীবনে নেমে আসে হতাশার কালো মেঘ।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় পুরুষের পাশাপাশি নারী কর্মীদের বাজার বেশ চাঙ্গা। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডিডব্লিউয়ের তথ্য মতে, তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্র কুয়েতের দশটি বাসাবাড়ির প্রায় ৯টিতেই রয়েছে গৃহস্থালির কাজ। এসব দেশে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান ভিন দেশের নারীরা। এতে করে লাঘব হচ্ছে নারীর বেকারত্বের হার। তবে অপর পৃষ্ঠায় রয়েছে এর ভিন্ন চিত্র। চাকরির অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও নারীরা হিমশিম খাচ্ছে কাজের ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে। অবৈধ এজেন্সির সহস্র শিকড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশব্যাপী। যার দৌরাত্মে্য নারীরা ছুঁতে পারে না স্বপ্নের আলো। বহু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যায়!

অনেকে বৈধ এজেন্সি কর্তৃক নিরাপদে চাকরি পায় বটে; তবে একটা অংশ পাচারকারী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে পাচারের শিকারে পরিণত হয়। সিন্ডিকেটচক্র নারীদেরকে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়, কারো থেকে নেয় মুক্তিপণ, আবার কাউকে পাঠায় জঙ্গি সংগঠনে। বাংলাদেশ অভিবাসন এজেন্সির তথ্য মতে, নারী পাচারকারী চক্রে জড়িত রয়েছে জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী এবং কিছু ট্রাভেল এজেন্সি। যারা বিভিন্ন সময়ে কূটকৌশলে নারী পাচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ডিডব্লিউয়ের এক প্রতিবেদনে এসেছে, গত ১০ বছরে ভারতে অথবা ভারত হয়ে অন্য দেশে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি নারী পাচার হয়েছে। পাচার হওয়া নারীর বড় একটা অংশকে গৃহবন্ধী অবস্থায় বিনা পারিশ্রমিকে খাটাচ্ছে বিদেশি সুবিধাভোগীগোষ্ঠী। পাশাপাশি বন্দিরা শিকার হচ্ছেন শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের। বিবিসি অ্যারাবিকের গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, ফোরসেল এবং হারাজ (আরবি শব্দ) অ্যাপের মাধ্যমে নারী কর্মীর অবৈধ কেনাবেচার বাজার গড়ে উঠেছে অনলাইনেও। এদের ৯০ শতাংশই হলো ১৮-৪০ বছর বয়সী নারী। চাকরির নাম করে পাচার সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে একদিকে নারী কর্মীরা যেমন পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হচ্ছেন; অপরদিকে হারাচ্ছেন বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বৈধ সুযোগ। এতে সরকার হারাচ্ছে রেমিট্যান্স।

আর তাই, মানববিধ্বংসী এসব সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে ২০১২ সালে প্রণীত হয়েছে দেশের প্রথম নারী পাচার আইন। আইনের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাশাপাশি কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। সংঘবদ্ধ মানব পাচারের জন্য অত্র আইনের ৭ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও সর্বনিম্ন সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। নারী পাচারের ছোবল থেকে দেশের নারী সমাজকে রক্ষার্থে এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নিয়োগকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে এসব আইনের শতভাগ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও চাকরির সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ নিশ্চিতে সরকারি পদক্ষেপও অতি জরুরি। এতে করে কমে আসবে সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্য, হ্রাস পাবে নারী পাচার। যার ফলে প্রসারিত হবে নারীর বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ন্যায্য অধিকার।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন