বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পারিবারিক সংকটে বিপদে পড়ছে শিশুরা 

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০১:৫৪

একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে দুজন মানুষের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করা, একটু ছাড় দেওয়া, দুজন দুজনের সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নিয়ে চলার মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সম্পর্কের মাঝে ‘সন্দেহ’ নামক শব্দকে স্থান দেওয়া আর জেনেবুঝে নিজের পায়ে কুড়াল মারার মাঝে কোনো আহামরি পার্থক্য নেই। পৃথিবী এবং মানুষ সমানতালে এগিয়ে চলছে আধুনিকতার স্পর্শে। এই আধুনিকতার ছোঁয়া আমাদের বেশ সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ঠিকই, তবে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালে বোঝা যায়—আমাদের কাছ থেকে তার কেড়ে নেওয়ার তালিকাও নেহাত ছোট নয়।

বিশ শতকের পূর্বেও বাংলাদেশে একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারের সংখ্যা বেশ ভালোই ছিল। যৌথ পরিবারের সদস্যদের সবার মাঝে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ বন্ধন আপনা আপনিই তৈরি হতো। সবার প্রতি সবার অন্যরকম দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধাবোধ কাজ করত। একুশ শতকের দিকে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে একক পরিবারের দিকে মানুষ খুব বেশি ঝুঁকে পড়ল। ইংরেজিতে যাকে বলছে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। কোনো এক অজানা কারণে বৃদ্ধ বাবামায়ের সঙ্গে তথাকথিত আধুনিক কিছু সন্তানের একই ছাদের নিচে বসবাস করতে চরম আপত্তি বাঁধতে শুরু করল। যৌথ পরিবারের ইতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যাচ্ছে। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যদের মাঝে একে অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধকে, একক পরিবারে বিশ্বাসী সবাই প্রায় অতিরিক্ত ঝামেলা হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। সাধারণত একক পরিবারের স্বামী-স্ত্রী উভয়ই কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে থাকেন। পিতা-মাতার ব্যস্ততার ফলে সন্তানের সঙ্গে তাদের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। একটি শিশু বাবামায়ের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান, মমত্ববোধ ছাড়া শৈশব, কৈশোরের সময় পার করছে; এটি বড় রকমের ভয়ানক কথা। গুটিকয়েক পরিবারে এর ভিন্নতা থাকলেও পৃথিবী জুড়ে বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের হার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উভয়পক্ষের অসংখ্য যুক্তি থাকলেও আপাতত সেই আলাপচারিতায় যাচ্ছি না। একজন স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের পরবর্তী ঘটনার দিকে সচেতন দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিচ্ছেদ হওয়া ঐ দম্পতির ঘরে যদি কোনো সন্তান থেকে থাকে—তার ওপর। সময়ের প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজন—যাই বলা হোক না কেন—বিচ্ছেদপরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের নিজেদের মতো করে কোনো না কোনোভাবে মানিয়েই নেন। অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার মতো অবস্হায় পড়ে থাকে শুধু পরিবারের সন্তান। বাবা কিংবা মা যার সঙ্গেই সন্তান থাকুক না কেন, তার ভেতরে এক ধরনের বিশালাকারের অভাববোধ সৃষ্টি হয়।

পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর দুজনের কারো সঙ্গেই যে শিশু থাকার সুযোগ পায় না—তাদের পৃথিবীটা আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। মাঝ সাগরে ডুবে মৃত্যু হওয়ার চেয়েও ভয়ানক যন্ত্রণা যেমন হয়, সেভাবে তাদের সময় কাটে। পৃথিবীতে যত ধরনের অস্বাভাবিক পথ রয়েছে, সেই পথে চলতে তারা বাধ্য হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের শিশুরা কিশোর গ্যাং, খুন, ধর্ষণ এবং মাদক কারবারের মতো কঠিন সব অপরাধের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। অপরাধ জগতের পথের কাঠামো কিছুটা সংকটাপন্ন বা ভিন্ন ধরনের হয়। এই পথে পা বাড়ানো অধিকাংশ মানুষ পরবর্তী সময়ে চাইলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। সমাজের অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মতো করে ওরা বড় হতে পারে না। অনেকটা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের জীবনযাপন করতে হয় বলে সামাজিক রীতিনীতি বা নিয়মকানুনের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণাবোধ কাজ করে। ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘ যেমন চোখের পলকে আকাশ ঢেকে দেয়, তেমনি করে এই শিশুরাও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আকাশের মেঘ এক সময় পরিষ্কার হয় ঠিকই, কিন্তু অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া সেই শিশুটির আর্তনাদ আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাপনাকে ছুঁতে পারে না। স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার সুযোগ না পাওয়া সেসব ছেলেমেয়ের প্রতি কি তবে সমাজের কোনোই দায়িত্ব নেই?

লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন