বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বোঝা নয় 

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০২:১৫

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বলতে চিকিত্সাবিজ্ঞান অনুসারে ক্রোমোজমের ত্রুটির কারণে যাদের নারী বা পুরুষ কোনো শ্রেণিতেই অন্তর্ভুক্ত করা যায় না তাদের বোঝানো হয়। আমাদের সমাজে তারা হিজড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। এই হিজড়া নামটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে চলে আসে তাদের অপরাধ বা হয়রানিমূলক কাজ। রাস্তাঘাটে, বাস-ট্রেন-লঞ্চে মানুষকে হয়রানি করে টাকা উত্তোলন করে তারা। আপাতদৃষ্টিতে এটা আমাদের চোখে অপরাধ বা হয়রানি লাগলেও তাদের এই কাজটি করার সুযোগ করে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র। 

হিজড়ারা ভিন্ন লিঙ্গের হওয়ার কারণে তাদের আমাদের সমাজে বা রাষ্ট্রে নিচু চোখে দেখি এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করে থাকি। এক কথায় বলতে গেলে তারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবদিকে নিগ্রহের শিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যার কারণে দেখা যায় তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হতে অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য হয়। একজন নারীপুরুষ জীবনধারণ করার জন্য যে রকম মৌলিক চাহিদার প্রযোজন রয়েছে, তেমনি হিজড়াদেরও মৌলিক চাহিদা প্রযোজন রয়েছে। কিন্তু তারা ভিন্ন লিঙ্গের হওয়ার কারণে আমরা তাদের কথা তেমন মনে রাখি না। বরং তাদের জন্য তাদের পরিবারকে নিচু চোখে দেখি। এক কথায় হিজড়া সম্প্রদায়কে আমরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখছি। তারাও আমাদের মতো মানুষ, তাদেরও ক্ষুধার যন্ত্রণা আছে, সেটা আমরা চিন্তা করে দেখি না। আমরা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে তেমন সুযোগ সৃষ্টি করে না দেওয়ার কারণে তারা জীবনধারণের জন্য পথেপ্রান্তরে ঘুরে বাস-ট্রেন-লঞ্চ এবং বিভিন্ন স্হান থেকে টাকা তোলে।

অনেক সময় দেখা যায় রাতের ট্রেনে-লঞ্চে তারা ঘুমন্ত মানুষকে জাগ্রত করে টাকা তোলে। যার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের বোঝা বানিয়ে না রাখি তাহলে ভিক্ষাবৃত্তি বা অপরাধমূলক কাজটি করতে হতো না। কারণ অভাব না থাকলে স্বভাব খুব অল্প মানুষের নষ্ট হয়। দেশের ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ কার্যক্রমের প্রাথমিক হিসাব মতে দেশে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন। এই সংখ্যাটি আমাদের মোট জনসংখ্যা থেকে হিসাব করে দেখলে দেখা যায় তারা সংখ্যায় অতি ক্ষুদ্র। তার পরও কেন তাদের বোঝা বানিয়ে রাখা হচ্ছে? চাইলে তাদেরও জনশক্তিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। আমাদের দেশের সব হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সরকারি উদ্যোগে একত্র করে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে তাদের শিক্ষা এবং পাশাপাশি আত্মকর্মস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য স্বতন্ত্র কোনো প্রতিষ্ঠান চালু করলে আশা রাখি আমাদের হিজড়া সম্প্রদায়কে ভিক্ষাবৃত্তি, অপরাধ ও হয়রানিমূলক কাজ থেকে মুক্ত করতে পারব। ধীরে ধীরে তাদের শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করতে পারলে তারাও দেশের বোঝা না হয়ে জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

একটি উদাহারণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী বোঝা নয়, সেটা কিন্তু আমার এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দেখলে বুঝতে পারি, এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ছয় নম্বর ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের নজরুল ইসলাম ঋতু। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সুন্দর মতো ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাই বলা যায়, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করে বোঝা বানিয়ে না রেখে শিক্ষা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের আওতায় এনে আত্মনির্ভরশীল করলে তারা নিজেরা কর্ম করে জীবনধারণ করবে। প্রচলিত টাকা তোলা রীতি বিলুপ্ত হবে। সাধারণ মানুষ তাদের হয়রানি হতে মুক্তি পাবে। তারাও সমাজে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। তাই রাষ্ট্রের দরকার তাদের জন্য অতি জরুরি একটি কর্মসূচি হাতে নেওয়া।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন