মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে কবে? 

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০২:৪৫

বছর ঘুরে প্রতিবারের মতো এবারও শুরু হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ এ জন্যই বলছি, জনবহুল এ দেশে প্রতি বছর যে সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তার খুব সামান্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতি সিটের বিপরীতে লড়তে হয় ৫০-৬০ জন বা ততোধিক। একটা যুদ্ধসম পরীক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে ভর্তিচ্ছুরা যখন একটা নতুন জীবনে পদার্পণ করেন তখন তারা সেই কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে নানান রঙিন স্বপ্নের ডালপালা এঁকে থাকেন। 

কারো স্বপ্ন থাকে খুব ভালো ফলাফল করে বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করবেন, কারো বা সুশিক্ষা অর্জন করে দেশকে সেবা করবেন। কিন্তু নবীন শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে বছরের শুরুতেই। একে তো সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ অন্যদিকে নানান প্রতিকূলতায় অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলেন। ছাত্রত্ব নেই এমন মানুষের কারণে থাকতে হয় গণরুমের বিভীষিকাময় জঞ্জালে। উচ্চ শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার যে প্রধানগুলো আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসমূহের গণরুম কালচার। পত্রিকার পাতায় মাঝে মধ্যে দেখা যায়, বিশ্বের সেরা ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। এবারের ওয়েবম্যাট্রিক্স ২০২২ অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দেড় হাজারের কাছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়েও এই চিত্র খুব একটা সুখের না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বাজেটের কমপক্ষে ছয় শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয় তাদের দেশের শিক্ষা খাত এবং গবেষণায়। কিন্তু আমাদের দেশে নানান প্রতিকূলতার কারণে বাজেটে বরাবরই ঘাটতি লক্ষণীয়। প্রতি বছর বাজেটে টাকার পরিমাণ বাড়ছে ঠিকই কিন্তু জিডিপির ঐ আদর্শ অনুকরণ করা হচ্ছে না। যার ফলে প্রভাব পড়ে শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের এই মৌলিক অধিকারে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা দেশের আনাচেকানাচে থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসেন। এক জন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করেন তখন তাকে হল বা মেসে থেকে পড়াশুনা করতে হবে। আবাসন সংকট হলে থাকতে হয় ঘিঞ্জি পরিবেশে গাদাগাদি করে একেক রুমে ৪০-৫০ জন করে। সক্ষমতা জোরদার করা না গেলে এক রুমে এসব মানবেতর জীবনযাপন আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাবে। শিক্ষার এই সুষ্ঠু পরিবেশ মৌলিক অধিকার বলেই মানি। তাছাড়া শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবার আরো বেশকিছু কারণ রয়েছে বইকি। একে তো গণরুমে ৪০-৫০ জন করে থাকতে হয়, তার ওপর প্রথম বর্ষ থেকে অন্যান্য বর্ষের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকটা ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। কখন না জানি কাউকে সালাম দিতে মিস হয়ে গেলে ডাক পড়বে অতিথিদের বিশ্রামের জন্য বানানো এক বিশেষ কক্ষে। গেস্টরুম কালচার সবারই জানা। তারপরও এই ভয়াল সংস্কৃতি কেন দূর করা যাচ্ছে না—সে অনেক গবেষণার বিষয়। এখানে বরং পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া উচিত—শিক্ষা নয়, এখানে মানসিক-শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এর ফলে এক জন শিক্ষার্থী কত ভুক্তভোগী তিনিই ভালো জানেন। 

পরীক্ষার আগের রাতে শারীরিক মানসিক নির্যাতিত হয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আশা করা বোকামি। এসবে শিক্ষার মান কখনো বাড়বে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালগুলোয় কত গ্রাফিতি চোখে পড়ে। তার মধ্যে একটি ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা।’ সুবোধ কেন পালিয়ে যাবে, এই দেশটা তার, ঐ যুদ্ধসম পরীক্ষা পাশ করে সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তাকে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জীবনের সঙ্গে জড়ানো অপরিহার্য সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। এই প্রশ্নগুলো কে কাকে করবে? শিক্ষার্থীদের প্রথম শ্রেণির সুবিধাই পারে এক লাফে বৈশ্বিক র‍্যাংকিং বাড়িয়ে দিতে। শিক্ষকদেরও এগিয়ে আসতে হবে হাতেকলমে গবেষণা করতে, শিখতে এবং শেখাতে। পুরো সিস্টেমে সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে পারলেই কেবল বহির্বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান দেখা যাবে।

হ লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন