শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লোডশেডিং ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা 

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ০০:৩৩

বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। সকালে যে-ঘড়ির অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে, যে পেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করি, যা দিয়ে নাশতা করি, যা দেখি, যে বাহন দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাই, যে-ফোন দিয়ে মুহূর্তেই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে কথা বলতে পারি, যে রেডিও-টিভির সাহায্যে খবর শুনি বা বিনোদন করি, যে ওষুধ মরণব্যাধি থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে মানুষের গড় আয়ু করেছে বৃদ্ধি, সবশেষে রাত্রিতে যে ফ্যান বা এসি চালিয়ে আমরা ঘুমোতে যাই—এসবই বিজ্ঞানের অবদান। বিজ্ঞান ছাড়া এক পা এগোনোর উপায় নেই। 

আজকের বিজ্ঞানের যুগে যে দেশ বিজ্ঞানে যত অগ্রগ্রামী সে দেশ তত উন্নত, সে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান তত উন্নত। এই বিজ্ঞানের কাঁচামাল হলো শক্তি। আর শক্তির কাঁচামাল বলা যায় জ্বালানিকে। যে দেশ যত উন্নত সে দেশে মাথাপিছু শক্তির ব্যবহার তত বেশি। জ্বালানি এমনই এক জিনিস, যার সঙ্গে সবকিছুর সম্পর্ক আছে। জ্বালানি ছাড়া চলে না কিছুই; যার দাম ওঠানামার সঙ্গে সব দ্রব্যের দাম ওঠানামা করে।

আর এজন্যই বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং জ্বালানি তেল আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি ডিজেলচালিত সব বিদ্যুৎকেন্দ্রেও আপাতত বন্ধ থাকবে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে। আর বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে সারা দেশে লোডশেডিং করে চলছে। আর জ্বালানি খাতে ভর্তুকি লাগাম টানার কথা বলেছে অর্থ বিভাগ। এসব বিবেচনায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, এসব পদক্ষেপ সাময়িক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

বর্তমান যুগকে বিদ্যুতের যুগও বলা হয়। যতগুলো বড় আবিষ্কার তার মধ্যে বিদ্যুৎ অন্যতম। যে দেশে মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার যত বেশি সে দেশ তত উন্নত। বিদ্যুৎ ছাড়া বর্তমান জীবন কল্পনা করা যায় না। বিদ্যুৎ না থাকলে জ্বলে না বাতি, বন্ধ হয়ে যায় ফ্যান, টিভি, কম্পিউটার, এসি, মুমূর্ষু রোগীর অপারেশন থিয়েটার, সেচপাম্প—এক কথায় মানুষের জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। এই বিদ্যুতের অপচয় কম হচ্ছে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্লাশরুম, অফিসরুম, এমনকি প্রতিষ্ঠান প্রধানের কক্ষে কেউ না থাকলেও বাতি জ্বলছে, ফ্যান ও এসি চলতে দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন অফিসের চিত্রও একই।

সুতরাং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য কিছু পদক্ষেপ অতি জরুরি। বৈদ্যুতিক শক্তি বেশি লাগে এমন বৈদ্যুতিক ফিলামেন্ট বাল্ব পরিহার করে ফিলামেন্টবিহীন কম বৈদ্যুতিক শক্তি লাগে এমন বাল্ব (এনার্জি সেভার, এলইডি) ব্যবহার করে অনায়াশেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়। বিদ্যুতের সিস্টেম লসের নামে একশ্রেণির বিদ্যুৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ সংযোগ দিয়ে বাণিজ্য করছে অথচ এই বিদ্যুতের অভাবে কৃষকের সেচপাম্প না চলায় ফসলের জমি ফেটে চৌচির, মিল-কারখানা বন্ধ, মুমূর্ষু রোগীকে দেখা যাচ্ছে কাতরাতে। একটু সচেতন হলেই এসব অপচয় রোধ করা যায়। হাসপাতাল এবং গবেষণা-প্রতিষ্ঠান ছাড়া এসির ব্যবহার সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্ধ করা দরকার। সাধারণত শহরের ভিআইপি এলাকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ রাখার চেষ্টা দেখা যায়। অন্য এলাকায় দেওয়া হয় অসহনীয় লোডশেডিং। আসলে গুরুত্বপূর্ণ কারা—যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলায়ে ১৭ কোটি মানুষের খাবার জোগায়, গার্মেন্টস বা অন্য কোনো শিল্প উত্পাদনে হারভাঙা পরিশ্রম করে পণ্য উৎপাদনের ফলে আহরিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা, তারা না অন্য কেউ! হাসপাতাল, গবেষণা-প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও সেচকাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা দরকার। লোডশেডিংয়ের রুটিনটাও জনগণের জানা থাকলে সে অনুযায়ী তাদের সব কাজের পরিকল্পনা করতে পারে।

খনিজ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সারা দুনিয়াতে আজ মানুষের নজর পড়েছে সূর্যের শক্তির দিকে। সূর্য থেকে প্রতি বছর পৃথিবীতে যে শক্তি এসে পড়ে তার পরিমাণ সারা বছরে মানুষ যে শক্তি ব্যবহার করে তার চেয়ে বহু গুণ বেশি। বাংলাদেশে যে পরিমাণ সৌরশক্তি এসে পড়ে তা আমাদের সারা বছর মোট শক্তির চাহিদার চেয়ে বহু গুণ বেশি। সৌরশক্তি ব্যবহারে বেশ সুবিধে আছে। সৌরশক্তি প্রায় অক্ষয়, অর্থাৎ এর শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় নেই, সূর্যের আলো কিনতে পয়সা খরচ করতে হয় না। অফুরন্ত সূর্যকিরণ পৃথিবীতে পড়ছে সারা বছর ধরে। তাছাড়া তেল বা কয়লা জ্বালালে ধোঁয়ায় নানা রকম বিষাক্ত গ্যাস বেরোয় বলে পরিবেশ দূষিত হয়। সৌরশক্তিতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার কোনো ভয় নেই। সৌরশক্তি আগামী দিনে মানুষের বড় ভরসা। পৃথিবীর অনেক দেশেই সৌরশক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ। এখানে বছরের অধিকাংশ সময় সূর্য প্রখরভাবে তাপ বিকিরণ করে। আমাদের দেশে গড়ে প্রতি মাসে প্রতি বর্গমিটারে ১৫০ থেকে ১৭৫ কিলোওয়াট সৌরশক্তি ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে। দেরিতে হলেও আমাদের দেশেও সৌরশক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। কী করে এই সৌরশক্তির ব্যবহার আরো দ্রুত বৃদ্ধি করা যায়, সে দিকে নজর দেওয়া উচিত।

এ দেশে বায়োগ্যাসের ব্যবহার সম্ভাবনাময়। বায়োগ্যাসের সাহায্যে রান্না করা ও হ্যাজাকের ম্যান্টল জ্বালানো যায়। গাস নির্গমনের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা উন্নতমানের জৈব সার। এ গ্যাস পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। পরিবেশ দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর। আমরা এসব বিষয়ে আরো সজাগ, আরো সচেতন হতে পারি। এজন্য দেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, সম্পৃক্ত করতে হবে শিক্ষক, মসজিদের ইমামসহ অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত, জনপ্রতিনিধি ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের। এজন্য সরকারি বিভিন্ন প্রচেষ্টাও চালাতে হবে।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, টাঙ্গাইল

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন