কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার জরুরি 

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২২, ০৫:৩০

কয়েক দশকের তুলনায় নারীর ক্ষমতায়ন ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছে ঘরে-বাইরে নারীর পদচারণা। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সিংহভাগ অংশে নারী। এমনকি ২৭ শতাংশ নারী সরকারি চাকরিজীবী। আশা করা যাচ্ছে, কয়েক বছরের মধ্যে এ সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ হবে।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক হওয়ার ফলে সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব পড়ে মায়ের ওপর। শিশুর লালনপালন ও সার্বিক বিকাশে মাকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। একটি নবজাতকের সবচেয়ে নিরাপদ ও যত্নশীল আশ্রয়স্থল মায়ের কোল। মা তার উষ্ণ অনুভূতির সাহায্যে শিশুকে পরম মমতায় বুকে আগলে রাখেন। মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড শিশুর প্রতি মায়ের স্নেহ-মমতার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বলেন, অবহেলা এবং স্নেহপূর্ণ পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নতায় শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়। অন্যদিকে চাকরিজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি মাত্র ছয় মাস। কিন্তু একটা বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য সবার আগে মায়ের পাশে থাকা উচিত। শৈশবকালের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর নারীরা জাঁতাকলের মধ্যে পড়ে। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে সন্তান লালনপালন।

সম্প্রতি প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ কর্মস্থলে ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ বা ‘দিবাযত্ন কেন্দ্র’ না থাকায় শিশুর লালন-পালনে নারী কর্মীদের অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে হয়। এমনকি পুরুষ সহকর্মীদের সামনে বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। যদি প্রত্যেকটা সেক্টরে নারীদের সুবিধার্থে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকে, তাহলে তারা অসুবিধার সম্মুখীন হবে না। ডে-কেয়ার শিশুদের থাকা-খাওয়া, খেলাধুলা, বিনোদন, ঘুম ও প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থা থাকলে অনেকটা নিশ্চিন্তে কর্মে মনোনিবেশ করতে পারবে। কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের পরিমাণ বেড়ে যাবে।

গণমাধ্যমে অনেক সময় দেখা যায়, গৃহকর্মীর কাছে শিশু নির্যাতন। তাছাড়া গৃহকর্মীরা অপরের সন্তান লালনপালনে অমনোযোগী। কতিপয় আতঙ্কের কারণে গৃহকর্মীর কাছে বাচ্চা রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানান্তর, কর্মক্ষেত্রে বদলি, গ্রাম ও নগরায়ণের পার্থক্য, উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশা ইত্যাদির ফলে ক্রমশ যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে অণু পরিবার। সেক্ষেত্রে বাচ্চা লালনপালনের জন্য আপনজনদের কাছে পাওয়া দুষ্কর। উল্লিখিত সমস্যার কারণে অনেক মা চাকরিতে যোগদানের সাহস পান না। আবার যারা বিভিন্ন চাকরিতে নিযুক্ত, তাদের ঘরে-বাইরে চ্যালেঞ্জিং জীবন যাপন করতে হয়। অনেকেই বাচ্চাকে ঠিকমতো লালনপালনের জন্য নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেয়।

কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে প্রত্যেকটি কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শুধু কর্মস্থলে নয়, নারীর উচ্চশিক্ষা সুনিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুব্যবস্থা থাকা অতীব জরুরি। কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাবে নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নততর কর্মপ্রত্যাশা, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য ইত্যাদি। প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি করে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকলে নারীরা সমাজের ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ক্যারিয়ার গঠনে উদ্যমী হবে। এটা একদিকে যেমন নারীর কর্মদক্ষতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তেমনি শিশুর সঠিক সামাজিকীকরণ সুনিশ্চিত হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন