ছোট্ট প্রকল্পেই চিন্তার পরিবর্তন

আপডেট : ০২ জুন ২০২৪, ১৮:০২

সময়ের সঙ্গে শিক্ষার মান বেড়েছে। ছেলেদের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরাও। তবে মেয়েদের জন্য আলাদাভাবে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠলেও, তাদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিতে মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে। মেয়েদের মাসিক চলাকালীন সময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন পরিবর্তনের ব্যবস্থা থাকা দূরে থাক, পরিচ্ছন্ন শৌচাগারই নেই অনেক স্কুল-কলেজে।

বিষয়টি মাথায় রেখে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম (সিআইএইউ) মেয়েদের জন্য স্বল্পখরচে মানসম্মত শৌচাগার নির্মাণের একটি নমুনা বা প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে সিআইএইউ-এর নির্বাহী পরিচালক স্থপতি অধ্যাপক ড. আদনান মোর্শেদের নেতৃত্বে এটির নকশা করেন শাফায়েত মাহমুদ, তাহসিন রেজা আনিকা, ফয়সাল বিন শফি ও আরিজা রশিদ। প্রথমটি নির্মাণ করা হয় বরিশালের রায়াপুর সৈয়দ আব্দুল লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. সৈয়দ সাদ আন্দালিব এটির উদ্বোধন করেন।

GPT__Render_2.5

পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে নকশা করা শৌচাগারটি স্রেফ একটি স্থাপনা নয়, এটি ছিল একটি গবেষণা প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট স্থপতিরা লক্ষ্য করেন, তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেয়েরা প্রকৃতির ডাকা সাড়া দিতে যাবার সময় একধরনের অনিরাপত্তায় ভোগে। এছাড়া অন্ধকারাচ্ছন্ন, অপরিষ্কার ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকার সমস্যা তো আছেই। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরী মেয়েই মাসিকের প্রথম তিনদিন স্কুলে যায় না। ১১ শতাংশ স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। মাত্র ৩ শতাংশ স্কুলে রয়েছে ব্যবহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলার ব্যবস্থা। যার ফলে ৬৯ শতাংশ মেয়েরাই স্কুল চলাকালীন সময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন পরিবর্তন করার সুযোগ পায় না। এটি তাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

এ বিষয়গুলো চিন্তা করেই সিআইএইউ-এর স্থপতিরা এমন একটি শৌচাগার তৈরির পরিকল্পনা করেন, যেটির সীমিত খরচে নির্মাণ করা হবে এবং মেয়েদের জন্য সকল সুবিধা দেবে। একসঙ্গে কয়েকজন মেয়ে এতে ওযু, হাত ধোয়া ও শৌচাগারের সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে, যেটি তাদের অনিরাপদবোধ করা দূর করবে। এছাড়া স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন ডিস্পেন্সার থাকবে এতে, যেখান থেকে তারা ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারবে। ব্যবহৃত ন্যাপকিন ফেলার জন্যও ব্যবস্থা থাকবে। ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও শৌচাগারে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে, পাশাপাশি বেসিনে ব্যবহৃত পানি চলে যাবে বাগানে। এতে করে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব হিসেবে কাজ করবে স্থাপনাটি। ছাদের ওপর সংযুক্ত থাকবে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে যেকোনো স্কুল ক্যাম্পাসে এটি নির্মাণ করা যাবে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে মেয়েরাই।

পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত এই শৌচাগারটি স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করবে। ছবি: সিআইএইউ

স্থপতি অধ্যাপক ড. আদনান মোর্শেদ বলেন, এই ছোট একটি প্রকল্পও মানুষের চিন্তাচেতনা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় মানুষ এমনকি ছেলে শিক্ষার্থীরাও মেয়েদের মাসিক ও বিশেষ চাহিদাগুলোর প্রতি সম্মান দেখাবে। এটি মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও সহায়তা করবে, শিক্ষার্থী হিসেবেও তারা ভালো ফল করবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও স্যানিটেশনের বিষয়ে এখনো সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অযোগ্য শৌচাগার চোখে পড়ে। আমরা এর থেকে বের হয়ে আসতে চাই। সে কারণেই আমাদের তৈরি করা ছোট প্রোটোটাইপটির মাধ্যমে একটা ইতিবাচক বার্তা দিতে চেয়েছি।

ইত্তেফাক/এসটিএম