ফুলেল শিশু নয়, ওরা পথশিশু। পথশিশু বলতে সাধারণত পথে অবস্থানকারী শিশুদেরকে বোঝায়। অর্থাৎ যাদের জীবনযাপন কেবলমাত্রই পথের মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে ওরা সাধারণ শিশুর মতো নয়। পারিবারিকহীনতার মধ্য দিয়েই তাদের বড় হতে হয়। মায়ের আদর, বাবার ভালোবাসা, ভাইবোনের সম্পর্ক তাদের মাঝে খুবই অপ্রতুল। জ্ঞানের পর থেকেই পারিবারিক ছিন্নতার মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হয়। এদের মধ্যে কেউ হয়তো তার বাবাকেই দেখেনি কখনো।
একটু বুঝ হতে না হতেই বেরিয়ে পড়তে হয় জীবিকার সন্ধানে। তাদের জীবন মনে হয় একদম সামাজিকতার বহির্ভূত। অপরদিকে বলা যায় তারা শিশু শ্রমজীবী। আর একটু বড় হলেই মা একদিকে, পথশিশুরা থাকে অন্য দিকে। কারণ একটাই, পেটের দায়ে। এভাবেই জীবন দাড় করিয়ে দেয় এক নির্মম বাস্তবতার দিকে। সমাজের কাছে হয়ে ওঠে ছিন্নমুল শিশু বা পথশিশু। কথায় আছে, ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’। পারিবারিক বন্ধন না থাকায় বেছে নিতে হয় অন্য কোনো সঙ্গ। আর সেই সঙ্গই যদি হয় খারাপ, জীবন যেন হয় অগ্নির মতো। তাইতো ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুরা পাড়ি জমাচ্ছে মাদকাসক্ত জীবনে। মাদকাসক্তের অন্যতম কারণ হলো পথশিশুদের নির্দিষ্ট শিক্ষা, মানসম্মত স্বাস্থ্য, পুষ্টিকর খাবারসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া। স্বাভাবিক সন্তানদের মতো লালিত পালিত হওয়া হয় না তাদের।এদের তেমন বাসস্থান ও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। তাদের একমাত্র নিত্যসঙ্গী ময়লাযুক্ত খোলা আকাশ, রেল স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, লঞ্চ বা ফেরিঘাট অথবা নোংরা কোনো জায়গা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্য মতে, দেশের প্রায় ৪ লাখের বেশি পথশিশু রয়েছে। যার অর্ধেকই অবস্থান করছে রাজধানীর ঢাকায়। আবার জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনেসকোর তথ্য মতে, বাংলাদেশের পথে শিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য মতে, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। [সূত্র: দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা] একাকীত্বের কষ্টে, ক্ষুধার জ্বালা, মানসিক অশান্তি এমনকি হতাশার জন্য ভিড় করছে মাদকাসক্ত নামক ধ্বংসস্তূপ জীবনে। বাংলাদেশ শিশু ফোরামের তথ্য মতে, বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ শিশুরাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকাসক্তে আসক্ত।
সম্প্রতি প্রথম আলো পত্রিকার তথ্য মতে, দেশের ২১ শতাংশ পথশিশুকে মাদকাসক্তের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। আর পথশিশুর ৫৮ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)-এর গবেষণায় এ চিত্র অবলোকন করা যায়। অধিদপ্তরটি ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে শিশুদের মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার করার তথ্য প্রকাশ করছেন। গত রবিবারে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালনকালে মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘মাদক সেবন রোধ করি, সুস্থ সমাজ জীবন গড়ি।’ সেই দিবসের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী ১ হাজার ৬০০ পথশিশুর সাক্ষাৎকারে পথশিশুদের মাদকাসক্তের তথ্য মেলে। যা হিসাব মতে, ৫৮ শতাংশ পথশিশুরা মাদকাসেবী। এমনকি সেই ৯২৮ জনের মধ্যে ৩৩৬ জন শিশুর মতে, তারা মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদকের বাহক হিসেবে কাজ করে। গবেষকদের মতে, পথশিশুরা অন্যান্য মাদকসেবীর তুলনায় অতি সহজেই মাদক সেবন করে থাকে। মাদকাসক্তের মধ্যে ৫৩ শতাংশ শিশু সরাসরি কারবারিদের থেকে মাদক ক্রয় ও লেনদেন করে থাকে। পথশিশুদের মধ্যে ১৪ শতাংশ শিশুর মতে, ১০ বছর হওয়ার আগে থেকেই মাদক ব্যবহার করে আসছে।
গবেষণার তথ্য মতে, ৫৫ শতাংশ শিশুরাই স্বাস্থ্যের দিক থেকে স্বাভাবিক নেই। এবং ৬৪ শতাংশ শিশুর নিজেকে পরিচালনার সক্ষমতা নেই। যার জন্য সামাজিক সমস্যাবলীতে জড়িত হচ্ছে গভীরভাবে। যেমন, জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, ছুরিকাঘাত, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নানাবিধ অবৈধ কাজ করে থাকে। এর চমৎকার উদাহরণ হিসেবে একটি বাস্তব ঘটনা বলি, ২০১৬ সালের দিকে তখন আমি শাহজাদপুর উপজেলার দ্বারিয়াপুরে থাকতাম। বিকালে ঘুরতে গেলে কিছু অল্প বয়সি ছেলেদের দেখা যেত। মূলত তারা ক্ষেতের ফাঁকা এলাকাতে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করত। নাম তার ড্রান্ডি। যদিও এই মাদকদ্রব্য সম্পর্কে তখন জানা হয়নি। পরে বিস্তারিত জেনেছি। পলিথিনের মধ্যে আঠার সাহায্য আগুন লাগিয়ে ঘ্রাণ নিয়ে নেশায় আসক্ত হতো। যেটা সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। এই রকম বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার আনাচেকানাচে উঠতি বয়সি ছেলেদের মধ্যে মাদকদ্রব্য গ্রহণের পরিমান বেশি পরিলক্ষিত হয়। দিনে দিনে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে এরকম হাজার হাজার শিশু, কিশোরেরা। নেশাদ্রব্যর মধ্যে বেশির ভাগ আসক্ত হচ্ছে গাঁজায়। কারণ, গাঁজার দাম তুলনামূলক অন্যান্য মাদকের চেয়ে সহজলভ্য। আমাদের দেশে ৩১.৭ শতাংশ শিশুরা গাঁজা সেবনে আসক্ত। ড্রান্ডিতে আসক্ত ১৫.২ শতাংশ শিশু।
এমন নেশাগ্রস্ত হওয়ার ফলে নৈতিক অবক্ষয়, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চরম আকারে বেড়েই চলছে। নাম বলতে অনিচ্ছুক এক যুবককে হতাশার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে মায়া-মমতা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। দিনে দিনে কষ্ট, হতাশা বাড়তে থাকে। পরবর্তীকালে নেশা নামক জগতে সামিল হয়ে গেলাম। এছাড়া মাদকাসক্তের মধ্যে অধিকাংশ হতাশাগ্রস্ত, মনোবলহীন অলস ও অসৎ সঙ্গের সাথী। তাই এমন ভয়ানক সমাজ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে সচেতন নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শিশুরাই শীর্ষে। কেননা ‘আজকের শিশু আগামী জাতির ভবিষ্যৎ।’ বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে পথশিশুদের প্রয়োজন আকাশচুম্বী।
তাই সরকার কর্তৃক ভিশন ২০৪১ সাল অর্জন করতে হলে এখনই সব শিশুদের একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালায় নিয়ে আসতে হবে। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ না নিলে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না। তাই সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন সংস্থাকে রাখতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দীর্ঘ সময় নিয়ে পারিবারিকভাবে শিশুদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পথশিশুদের সুন্দর জীবন বিনির্মানে শতভাগ আইনের কার্যকর নিশ্চিত করতে হবে।
হ লেখক :শিক্ষার্থী; সরকারি আকবর আলী কলেজ, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ
