জাতিসংঘের কাজ কি শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করা?

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:১৭

যুদ্ধ কখনো জাতিতে জাতিতে সংকট নিরসনের পথ হতে পারে না। যুদ্ধ ডেকে আনে মানবজাতির জন্য অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও অশান্তি এবং ভয়ংকর ধ্বংসলীলা। বিশ শতকের ইতিহাসে পৃথিবীতে দুটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে। গত শতকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) সংঘটিত হয়। বিশ্বে ইতিমধ্যে অনেক যুদ্ধ ঘটে গেছে এবং এখনো ঘটছে। কিন্তু এই দুই যুদ্ধের মতো এত প্রাণহানি এবং ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র অন্য কোনো যুদ্ধে এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি।

জাতিগত দ্বন্দ্ব থেকেই মূলত এ যুদ্ধের সূচনা। ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর একদল শান্তিকামী মানুষ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি লীগ অব নেশনস গঠন করেন। কিন্তু নানা কার্যক্রমে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয় এটি। যার ফলস্বরূপ ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা আগের সব যুদ্ধের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। লাখ লাখ লোক মারা যায়, পঙ্গুত্ব বরণ করে। যা গোটা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বের নেতৃবৃন্দ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এবং বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আবারও একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। নানারকম আনুষ্ঠানিকতা, সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অবশেষে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের আত্মপ্রকাশ ঘটে। জাতিসংঘে পাঁচটি স্থায়ী শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স একত্রিত হয়। এই পাঁচ দেশই পরমাণু শক্তিধর। জাতিসংঘে এদের লক্ষ্য হলো যুদ্ধমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্বের শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখা। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে উক্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কোনো মিল নেই। জাতিসংঘের তথাকথিত এই পাঁচ মোড়লই এখন বিশ্বের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের পাশাপাশি বিশ্বের সব দেশই নিজেদের সুবিধামতো মিত্র দেশের পক্ষ নিয়ে ভাগ হয়ে গেছে।

বিশ্বে অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রি বেড়ে গেছে। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এত অস্ত্রের কী প্রয়োজন! ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের দিকে তাকালেই দেখা যায় ফিলিস্তিনে প্রায়শই বিমান হামলার মাধ্যমে নিরীহ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এসবই জাতিসংঘের নীতি ও উদ্দেশ্যের বিপরীত। মূলত ইসরাইলকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে বলে একটি পরাশক্তি।  আবার গত ২২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়াও নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য অগণিত মানুষ নিহত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এ যুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। রাশিয়া তাদের তেল রপ্তানি বন্ধ করায় গোটা বিশ্বে জ্বালানি তেল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে অনেক দেশেই জ্বালানি সংকটের কারণে প্রভাব পড়েছে তাদের শিল্পের ওপর। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। করোনা-পরবর্তী এই যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়ে বিশ্বের অনেক দেশ দেউলিয়া হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা ও লেবানন দেউলিয়া হয়ে গেছে। এদিকে জাতিসংঘ শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে।

কয়েক দিন আগে স্বাধীনতাকামী দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানে মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি সফরে আসায় সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুরু থেকেই চীন তাইওয়ানকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। তাইওয়ানে ন্যান্সি পেলোসির সফরকে ঘিরে চীন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সেখানে যুদ্ধের মহড়াও চলছে। এখানে জাতিসংঘ কার্যকরী কোনো সমাধান করতে পারেনি।

মিয়ানমার গত পাঁচ বছর আগে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মামলা করে গণহত্যা হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং রায় রোহিঙ্গাদের পক্ষে যায়। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত তাদের ফেরত পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি জাতিসংঘ। বরং মিয়ানমারের সঙ্গে অবাধে আমদানি-রপ্তানিসহ সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে রাশিয়া, ভারতসহ অনেক দেশ। অন্যদিকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলমানদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চীন ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে আসলেও পুরো বিশ্ব নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এখানেও জাতিসংঘের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এসব পর্যালোচনা করে বলাই যায় জাতিসংঘ এখন শুধুই কাগজ কলমে। যুদ্ধ পরিস্থিতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে জাতিসংঘ ব্যর্থ। জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য দেশগুলো এখন বিশ্বে শুধু নিজের একক আধিপত্য বিস্তারে তৎপর রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে হিরোশিমা নাগাসাকি দিবসে জাতিসংঘের নবম মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস জাপানে এক সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বর্তমান পৃথিবীতে সংঘাত, যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। শক্তিধর দেশগুলো একে অন্যের মুখোমুখি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জাতিসংঘ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে। যার ফলস্বরূপ আরো একটি যুদ্ধ অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হবে বিশ্ববাসী।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেভাবে গোপনে ও প্রকাশ্যে জাতিসংঘের নিয়মের তোয়াক্কা না করে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু করেছে তাতে পারমাণবিক যুদ্ধ অত্যাসন্ন। আর পারমাণবিক যুদ্ধ মানেই গোটা পৃথিবী ধূলিসাৎ। কারণ বর্তমানে যে পারমাণবিক বোমাগুলো তৈরি করা হয়েছে এবং হচ্ছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানে ফেলা বোমার চেয়েও শত শত গুণ বেশি শক্তিশালী। এই অস্ত্র তৈরি ও মজুতের সক্ষমতার লড়াই চলছে। অর্থাৎ বিশ্ব ধ্বংসের সব আয়োজন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে বলা যায়। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, যাদের হাতে বিশ্বে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রয়েছে তারাই বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ কখনো সমাধানের পথ হতে পারে না। আমাদের জাতিগত দাম্ভিকতা পরিহার করতে হবে। এই পৃথিবী আমাদের জন্যই। তাই এটি রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।

লেখক : শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন