এনার্জি সিকিউরিটি ও টেকসই উন্নয়ন

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:০৭

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। বৈশ্বিক রাজনীতি ও ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানিসংকট এখন তীব্র। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে এখন আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে এনার্জি সিকিউরিটি  ও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন।

বর্তমানে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি-ঘাটতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্তরায়। আমরা যে অর্থনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে চাইছি, সেটি ব্যর্থ হবে যদি আমরা এনার্জি সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে না পারি। জ্বালানিসংকটের কারণে যদি আমাদের কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত আরএমজি (Ready Made Garments) অর্থাৎ তৈরি পোশাক বা পেশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ব। আর জ্বালানির বা বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পেলে উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পাবে। যার কারণে আমাদের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে তৈরি পোশাক বা আরএমজি সেক্টরে বৈশ্বিক মার্কেটে আমরা যে রাজত্ব করেছি তা হারাব।

এতদিন আমাদের শক্তির জায়গাটা ছিল কম মূল্যে ভালো পণ্য সরবরাহ করা। কিন্তু উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে তা সম্ভব হবে না। তখন আমাদের চেয়ে যারা কম মূল্যে বাজার ধরতে পারবে তারাই পরবর্তী সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। আর আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস বিশ্ববাজারে মার্কেট হারালে আমাদের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। আমাদের রপ্তানিযোগ্য পণ্য ও কৃষি খাতের সারের উৎপাদন ও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নিশ্চিত করলে হবে না, এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যও হাতের নাগালে রাখতে হবে, তবেই এনার্জি সিকিউরিটি নিশ্চিত হবে।

এবার আলোকপাত করা যাক, আমরা কীভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করে এনার্জি সিকিউরিটি এবং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারি। বাংলাদেশ একটা Gas  Prone Area বা গ্যাসপ্রবণ এলাকা। আমাদের দেশে যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা, তার তিন-চতুর্থাংশ আমরা নিজেরাই উৎপাদন করে থাকি। বাকি ৬ শতাংশ-১০ শতাংশ Spot Market থেকে আমদানি করা হয়। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা যে ৬ শতাংশ-১০ শতাংশ আমদানি করি, সেটি না করে যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ রিসোর্স থেকে চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করি, তাহলে আমরা আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট নিরসন করতে পারব। বর্তমানে আমাদের যে গ্যাস ফিল্ড আছে তা থেকে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ১০ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। একই সঙ্গে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ২ হাজার ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে। উত্তোলনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে জনগণ, শিল্পকারখানাসহ অন্যান্য গ্রাহকের মধ্যে আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে।

বর্তমানে আমাদের প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক উৎপাদিত গ্যাসের উৎপাদন ২ হাজার ৫৭০ মিলিয়ন ঘটনফুট এবং আমদানি করা দৈনিক ৫৯০ মিলিয়ন ঘনফুট সমপরিমাণ এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩ হাজার ১৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এ হিসাবে দৈনিক ঘাটতি রয়েছে ৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে  ৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের যে ঘাটতি তা আমরা নিজেরাই দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে পূরণ করতে পারব। যেমন :ভোলা নর্থ গ্যাস ফিল্ড (Bhola North Gas Field) আবিষ্কার করা হয় ২০১৮ সালে। সেখান থেকে এখনো গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়নি। আনুমানিক ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন সম্ভব। তাছাড়াও ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্পাদনসক্ষমতার অর্ধেক গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, যার পরিমাণ ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাইলে সেখান থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন সম্ভব। তাছাড়াও আমাদের দেশে যে পরিত্যক্ত গ্যাস ফিল্ডগুলো আছে তা আবার ওয়ার্ক ওভারের মাধ্যমে (Work Over) পুনরায় চালু করে গ্যাস উত্তোলন শুরু করলে বাকি ঘাটতিটুকু পূরণ করা যাবে অনায়াসে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন