পৃথিবীতে বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণ করে প্রত্যেকটা মানুষ যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে চায়। চলতে গিয়ে যখন ছন্দপতন হয়, বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শুধু কিশোর-কিশোরী নয়, এই প্রবণতা এখন ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির মধ্যেও প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৪ হাজার ৪৩৬টি। অন্যদিকে সেই সময়ের মধ্যে ৮ হাজার ৪৬২ জন প্রাণ হারিয়েছে করোনা ভাইরাসের কারণে। করোনা ভাইরাসে যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে তার থেকে আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছে ৭০ শতাংশ বেশি মানুষ। আত্মহত্যার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো হিসাবমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে আনুমানিক ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে।
আত্মহত্যাকে অ্যারোন দেখেছেন এভাবে, ‘আত্মহত্যা হলো আত্মহত্যাকারী কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক ঘটনা, যা মৃত্যু ঘটায়—Suicide is every case of death resultiry directly or indirectly from a positive or negative act performed by the victims himself and which strives to produce this result'। অনেক সমাজবিজ্ঞানীন এটিকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
মানুষ চলার পথে যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় আমরা সেগুলোকে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করি। যেমন, পারিবারিক কলহ, হাতাশা, বেকারত্ব, নির্যাতন ইত্যাদি। এসব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটগুলো আত্মহত্যার পুশ ফ্যাক্টর হিসেবে চিহ্নিত। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক বন্ধন পুল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। এখন আমরা যদি পুল ফ্যাক্টরকে শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে আত্মহত্যার পুশ ফ্যাক্টরগুলো কখনোই আমাদের জীবনকে সেভাবে প্রভাবিত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে ফলাফল হবে আত্মহত্যার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকে পারিবারিক বলয়ে আবদ্ধ। একজন মানুষ হঠাৎ করেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় না। ধীরে ধীরে সব পথে যখন তার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, তখনই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। মধ্যবর্তী সময়ে তার অনেক পরিবর্তন দেখা দেয়, যা পরিবার ও আত্মীয়স্বজন বুঝতে পারে। সুতরাং একজন মানুষের পরিবর্তন তার পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বুঝতে পারবে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক বন্ধন অনেকাংশে কার্যকর। এমনকি যাদের পারিবারিক বন্ধন বেশ শক্তিশালী তারা তুলনামূলকভাবে রোগে কম আক্রান্ত হয় (জার্নাল অব ফ্যামিলি সাইকোলজি)। যে ব্যক্তির পারিবারিক বন্ধন শিথিল তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। পুশ ফ্যাক্টরের মতো আর্থসামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে যখন পরিবারের কোনো সদস্য হতাশায় নিমজ্জিত তখন এগিয়ে আসতে হবে বাকি সদস্যদের। সেই সময়ে দরকার যথাযথ সচেতনতা এবং কাউন্সেলিং। পারিবারিক বন্ধন ও সচেতনতাই পারে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হ্রাস করতে। আত্মহত্যা নয় বরং বেঁচে থাকাই সার্থকতা।
লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
