গত ৯ আগস্ট থেকে সারা দেশে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে নিবন্ধিত ১৬৭টি চা-বাগানে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি শ্রমিক তাদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেন। ১৩ আগস্ট পর্যন্ত দুই ঘণ্টা কর্মবিরতির আন্দোলন চলতে থাকলেও শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও চা-শ্রমিক নেতাদের মধ্যস্থতায় তাদের মজুরি ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার ঘোষণা দিলে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেন। তারা জানান, বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা, তাতে দৈনিক ১৪৫ টাকা মজুরি তাদের দৈনন্দিন খরচ ও সংসার চালানোর জন্য একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। ফলে দাবি আদায়ে দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি রূপ নেয় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে। শ্রমিকরা দাবি আদায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চান। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব জায়গায় চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ও জীবনযুদ্ধের নানা চিত্র উঠে এলে এরই মধ্যে ঘোষণা আসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চা-বাগান মালিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী সব খোঁজখবর নেন এবং দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বৃদ্ধি করে ১৭০ টাকা নির্ধারিত করেন।
মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি বার্ষিক ছুটি, বেতনসহ উৎসব ছুটি আনুপাতিক হারে বাড়ানোসহ অসুস্থতা ছুটি বাড়ানো হবে। চিকিত্সাব্যয়ের চাঁদা মালিকপক্ষ বহন করবে। ভবিষ্যৎ তহবিলে নিয়োগকর্তার চাঁদা আনুপাতিক হারে বাড়বে। এ ছাড়া ভর্তুকি মূল্যে রেশনসুবিধা বাড়ানো হবে। চিকিত্সাসুবিধা, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পেনশন, চা-শ্রমিকদের পোষ্যদের শিক্ষা বাবদ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, গোচারণভূমি বাবদ ব্যয়, বিনা মূল্যে বসতবাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ শ্রমিককল্যাণ কর্মসূচি এবং বাসাবাড়িতে উৎপাদন বাড়বে। সবকিছু মিলিয়ে দৈনিক মজুরি ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার মতো পড়বে বলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়। তাতেই চা-শ্রমিকদের মাথার ওপর থেকে আঁধারের কালো মেঘ দূর হয়ে যায়।
সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানের মরিয়ম বেগমের আকুতি—১৭০ টাকা দিয়ে তো আর সংসার চলবে না; তবে প্রধানমন্ত্রীর কথায় কাজে নেমেছেন, তিনি নিশ্চয়ই তাদের দিক বিবেচনা করে সামনের দিনে চুক্তিতে ভালো মজুরি দেবেন। ‘প্রধানমন্ত্রী এবার আমাদের সমস্যার বিষয়টি জানলেন, ভবিষ্যতে আমাদের জন্য ভালো কিছু করবেন—এই আশায় আছি’ মালনীছড়া চা-বাগানের চা-শ্রমিক নমিতা রায়ের এমনটি আশা। গণমাধ্যমে দেখা যায় দেশের সবচেয়ে প্রাচীন চা-বাগান মালনীছড়ার শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সকালে মিছিলও বের করেন। মজুরি সমস্যার অবসান হওয়ায় হবিগঞ্জের শ্রমিকরা নৃত্য, গান ও মাদল বাজিয়ে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন।
এই আনন্দ বা মিষ্টি বিতরণ কীসের বার্তা দেয়? চা-শ্রমিকদের দুঃখ ঘোচানোর জন্য একজন শেখ হাসিনার প্রতি চা-শ্রমিকদের এমন আস্থা সত্যি পরিবর্তনের বাংলাদেশের বারতা দেয়। তারা হয়তো শুনেছেন শেখ হাসিনার বাংলাদেশে কেউ না খেয়ে বা গৃহহীন আশ্রয়হীন থাকবে না। তারা আরো বলেছেন, আমরা কাজে ফিরে যাচ্ছি কেবল প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে, যেন সামনের দিনে আমাদের জন্য আরো ভালো কিছু তিনি ব্যবস্থা করে দেন। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের মাঝখানে যারা কাজ করেন শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা দিতে তাদের আন্তরিকতা ঠিক থাকবে তো? বাংলাদেশের জনকল্যাণকর অনেক কাজেই কুচক্রী মহল ফায়দা লুটতে সদাজাগ্রত; পদ্মা সেতুর বেলায় আমরা দেখলাম ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে জনমনে কী বিভ্রান্তিকর ও ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো। কতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেল। তাই আমাদের সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশ আলোকিত হোক, তা একটা মহল চায় না, তাই ঘাপটি মেরে থাকা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সর্বদা সোচ্চার থাকতে হবে।
১৯৫৭-৫৮ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা-বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হয়েছিলেন, সে সময় তিনি চা-বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, শ্রমিকদের কল্যাণে প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু করেন, ঢাকার মতিঝিলে চা-বোর্ডের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। মৌলভীবাজারে টি-রিসোর্ট গবেষণা স্টেশন নির্মাণ করেন। ১৯৭২ সালে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ থেকে ঋণ নিয়ে শিল্পের উন্নয়নের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি করে চা-শিল্পকে ঢেলে সাজান। তিনি চা-শ্রমিকদের বিনা মূল্যে বাসস্থান, সুপেয় পানি, প্রাথমিক শিক্ষা, ও রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাই হয়তো চা-শ্রমিকরা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন জাতির পিতার কন্যা তাদের জন্য আবার নতুন জীবনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করবেন। তাই টানা ১৯ দিন আন্দোলন শেষে যখন চা-শ্রমিকরা জানলেন প্রধানমন্ত্রী তাদের হয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলছেন এবং তাদের মজুরিও জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন, এমনকি তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের সুখদুঃখ শুনবেন, তখনই দেশের প্রাচীন চা-বাগান মালনীছড়ার চা-শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সকালে মিছিল বের করেন, মিষ্টি বিতরণ করেন। বঙ্গবন্ধুকন্যাও তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় এতটুকু চিড় ধরতে দেননি, তিনিও তাদের আপন করে নেন। হয়ে ওঠেন জীবনের নতুন আশ্রয়, যেভাবে তার বাবা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান তাদের জন্য প্রজ্বলিত করেছিলেন আশার প্রদীপ।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
