শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লক্ষ্মীপুরে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, নেপথ্যে ‘বড় ভাই’রা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:৫৩

লক্ষ্মীপুরে দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। সংঘটিত হচ্ছে খুনের মতো ঘটনা। এ ছাড়াও নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। একে অপরের ক্ষমতা দেখাতে কয়েক জন মিলে পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন নামে গ্যাং-গ্রুপ গড়ে তুলছে। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, মাদক ও প্রেম নিয়ে বিরোধের জেরে তারা অহরহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। অর্থের বিনিময়ে অর্থদাতার প্রতিপক্ষের ওপরও আক্রমণ চালাচ্ছে উঠতি বয়সি ছেলেরা। এমনকি কিছু অর্থের বিনিময়ে খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়ছে তারা।

কিশোর গ্যাংয়ের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় ‘বড় ভাই’রা। নিজেদের আধিপত্য প্রকাশ করতে তারা পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছে। লক্ষ্মীপুরে খুনোখুনিতে কিশোর ও তরুণদের ব্যবহারের ঘটনাও বাড়ছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জেলা শহরের উত্তর তেমুহনী পেট্রোল পাম্পের সামনে তিন এসএসসি পরীক্ষার্থীর ওপর হামলা চালিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এ ঘটনায় মামলায় অভিযুক্তরা হলো—মো. প্রহর, মো. রাফি, সামি মুনতাসিম, মো. অন্তর, আরজু, অর্পন ও অজ্ঞাত ১২ জন। তারা প্রায় সবাই কিশোর এবং পৌরসভার বাঞ্চানগরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। তারা স্থানীয় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এর আগে গত ৮ জুন বিকালে বাইশমারা এলাকায় মোটরসাইকেলকে সাইড না দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাস্তায় ফেলে স্বামীসহ অন্তঃসত্ত্বা নারীকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে পেটান ইমন হোসেন ও তার সঙ্গে থাকা কয়েক জন কিশোর। ৫ মে দুপুরে সদর উপজেলার হাজিরপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ চন্দ্রপুর গ্রামের সমবয়সী ইমরান হোসেন এবং পাশের দীঘিল ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের সুজন হোসেন ও মো. বাপ্পী এক জন আরেক জনকে তুই বলে সম্বোধন করেন। পরে বাপ্পী ও সুজন আরও কয়েক জনকে নিয়ে এসে ইমরানকে মারধর করেন। এ সময় নাতিকে বাঁচাতে গেলে দাদা চাঁদ মিয়াকেও কিল-ঘুসি মারা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই চাঁদ মিয়া (৭০) নিহত হন। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই জেলা শহরের কোনো না কোনো এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কোনো না কোনো অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। তাদের ভয়ে রীতিমতো স্কুল-কলেজে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে অনেক ছাত্রী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরের উত্তর তেমুহনী পেট্রোল পাম্প, উত্তর তেমুহনী কালী বাজার সিএসজি স্ট্যান্ড, বাগবাড়ী করিম টাওয়ার, এনআর গ্রিন টাওয়ার, হাসপাতাল রোডের তৃপ্তি হোটেলের আশপাশে, রেহান উদ্দিন ভূঁইয়া সড়ক (সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমিসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডারস্থল। মাদক সেবন, স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের উক্ত্যক্ত করা, উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালানো, হর্ন বাজানো, ‘বড় ভাই’দের নির্দেশে মারধর করাসহ প্রতিনিয়ত তারা নানা অনৈতিক কার্যক্রম করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধে জড়িত কিশোরদের বিরাট অংশ নিম্নবিত্ত পরিবারের। তবে উচ্চবিত্ত পরিবারের কিশোরদেরও এখন ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষক ও ক্রীড়াবিদ মো. ইব্রহিম খলিল বলেন, লক্ষ্মীপুরে এখন বড় সমস্যা কিশোর গ্যাং। পরিবারকে জানতে হবে তার ছেলে বা মেয়ে কার সঙ্গে মেশে, কখন কী করে, কোথায় যায় এটা পিতা-মাতার দায়িত্ব। লক্ষ্মীপুর জজ কোর্টের এডভোকেট মোশারফ হোসেন মিঠু বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্যরা এলাকায় নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করতে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করছে। এ বিষয়ে সন্তানদের ওপর বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের নজরদারি রাখা খুব জরুরি।

জেলা পুলিশ সুপার মো. মাহফুজ্জামান আশরাফ বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ হ্রাস করা সম্ভব। আশা করি, লক্ষ্মীপুরে কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব বেশি দিন থাকবে না।

ইত্তেফাক/ইআ