সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিদ্যুৎ-সংযোগের নামে চা-শ্রমিকদের থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ

টেন্ডার ছাড়াই ৩৬টি খুঁটি পৌঁছার কারণ তদন্তে পবিস

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৫৭

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা চা বাগানের আওতাধীন এলবিন টিলা ফাঁড়ি চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের ঘরে পল্লী বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগ উঠেছে পল্লী বিদ্যুতের এক ঠিকাদার, তার সুপারভাইজার ও স্থানীয় এক ইলেকট্রিশিয়ানের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, ঘটনার শুরু প্রায় ৮ মাস আগে। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসের দিকে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য টেন্ডার পেয়েছেন জানিয়ে এলবিন টিলা ফাঁড়ি চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ঠিকাদার আব্দুল মালেক, সুপারভাইজার দুলু মন্ডল এবং স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান শাহাজান আহমদ। বিদ্যুৎ সংযোগের বিনিময়ে ৩৫০ চা-শ্রমিকের প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা করে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়ার চুক্তি করেন তারা। চুক্তি অনুযায়ী চা-শ্রমিকেরা অগ্রিম কিছু টাকাও দেন। এরপর সেখানে পল্লী বিদ্যুতের ৩৬টি খুঁটি আসলেও ঠিকাদার কোনো কাজ করেননি। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে চা-শ্রমিকেরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বড়লেখা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেন। এলবিন টিলা ফাঁড়ি চা বাগানের মন্দির এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সেই ৩৬টি খুঁটি এখনো রয়েছে।

এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, ফুলতলা চা বাগান ও এলবিন টিলা ফাঁড়ি চা বাগান পিডিবির আওতাধীন। এখানে কাজের জন্য পল্লী বিদ্যুতের কোনো টেন্ডারই হয়নি। ৩৬টি খুঁটি ঠিকাদার কিভাবে নিলেন তা তদন্ত করে দেখা হবে। 

পবিস, পিডিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলবিন টিলা ফাঁড়ি চা বাগানে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার জন্য ২০২০ সালের দিকে ডিজাইনের কাজ সম্পন্ন করেছিল মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। ওই বাগানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আওতায় গ্রাহক থাকায় মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জিয়াউর রহমান ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চেয়ে আবেদন করেন। এই বছরের ৩০ অক্টোবর পিডিবি অনাপত্তিপত্র প্রদান না করার কারণ জানিয়ে পবিসকে চিঠি দেয়। এরপর পিডিবির অনাপত্তিপত্র না পাওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ সব কার্যক্রম স্থগিত রাখে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। 

বাগানের হাসপাতালের কর্মচারী (ড্রেসারম্যান) শমীরন দাস বলেন, পিডিবির বিদ্যুতে সুবিধা না থাকায় আমরা পল্লী নিতে চেয়েছিলাম। ইলেকট্রিশিয়ান শাহাজান বলেছে টেন্ডার হয়েছে। ৩৫০ পরিবারের জন্য ঘর প্রতি ২ হাজার ৬০০ টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়। চা-শ্রমিকরা গরিব মানুষ। সবাই মিলে কষ্ট করে আমারা শাহাজানের মাধ্যমে দুলু মন্ডলকে প্রথম কিস্তিতে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছে। কাজ শুরু করলে বাকি টাকা কিস্তি করে দেওয়ার কথা। কিন্তু ৭-৮ মাস হয়েছে কাজই হয়নি।

এলবিন টিলা ফাঁড়ি চা বাগানের সর্দার সজল বুনার্জি বলেন, ঠিকাদার আব্দুল মালেক, দুলু মন্ডলের সঙ্গে আমরা শ্রীমঙ্গলের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা বলি। তারা বলেছে টেন্ডার পেয়েছে। তারা ঘরে মিটার পর্যন্ত পৌঁছে দেবে বলেছে। এতে ঘর প্রতি ২ হাজার ৬০০ টাকা করে দিতে হবে। এরপর একটি চুক্তি করি। পরে শাহাজানের মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছি। এখন পর্যন্ত কাজ হচ্ছে না। এটা নিয়ে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ। আমরা ঢাকায় পরিবেশমন্ত্রীর কাছে গিয়েও কথা বলেছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না। শনিবার শাহাজান যোগাযোগ করেছেন, বলেছেন টাকা দিয়ে দেবেন। কাজ করবেন না।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদার আব্দুল মালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হয়। কিন্তু কল না ধরায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন ঠিকাদার আব্দুল মালেকের সুপারভাইজার দুলু মন্ডল।

তবে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইলেকট্রিশিয়ান শাহাজান। তিনি জানান, ঠিকাদার মালেকের সুপারভাইজার দুলু মন্ডল বলেছেন, তারা ফুলতলা বাগানে কাজের জন্য টেন্ডার পেয়েছেন। এরপর শ্রমিকদের সঙ্গে ঘর প্রতি ২ হাজার ৬০০ টাকা করে নেওয়ার চুক্তি হয়। প্রথম কিস্তিতে ৭০ হাজার টাকা নিয়েছি। এর থেকে ৪৭ হাজার টাকা নিয়েছেন দুলু মন্ডল। কাজ না হওয়ায় খুব ঝামেলায় আছি। তবে এই টাকা একটি মিটার, রড এবং বোর্ডের জন্য বলে দাবি করেন শাহাজান।

পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ কুলাউড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. উসমান গনি বলেন, ফুলতলা চা বাগান এলাকায় পিডিবির উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন লাইন রয়েছে। গ্রাহকও আছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এনওসি চেয়েছিল। গ্রাহক থাকায় এনওসি দেওয়া হয়নি।

মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ফুলতলা চা বাগান এলাকায় পিডিবির লাইন থাকায় পবিসের টেন্ডার প্রক্রিয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আছে একই স্থাপনায় দুটি সংস্থার লাইন থাকতে পারে না। এ অবস্থায় চা-শ্রমিকদের থেকে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়াটা কোনো প্রতারক চক্রের কাজ। কোনো ধরণের টেন্ডার ছাড়া ওই এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের ৩৬টি খুঁটি কিভাবে পৌঁছালো তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করছি। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি