বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লোকসাহিত্য হারালে শেকড় হারাবে

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০০

লোকসাহিত্য একটি জাতির শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচায়ক। একটি জাতির জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায় লোকসাহিত্যের মাধ্যমে। লোকসাহিত্য মৌখিকরূপের সাহিত্য, যা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের সাধারণ মানুষের অতীত ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে লোকমুখ থেকে রচিত হয়। লোকসাহিত্যের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। এজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লোকসাহিত্যকে ‘জনপদের হূদয়কলরব’ বলে উল্লেখ করেছেন। গান-গীতিকা-গাথা-কাহিনি-ছড়া-প্রবাদ-ধাঁধা ইত্যাদি লোকসাহিত্যের অনুষঙ্গ, যা সাধারণ লোকের জন্যই লোকমুখে রচিত হয়েছে। চিরায়ত গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তাচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই লোকসাহিত্যের মাধ্যমে। লোকসাহিত্য আবহমান পল্লি বাংলার মানুষের জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহের যেন রঙিন নকশি সেলাই। 

দেশের ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের লোকসাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ। গ্রাম্য সরলতা, স্নিগ্ধতা, প্রাকৃতিক পরিবেশে বিমুগ্ধ সাধারণ মানুষের মুখ থেকে অবচেতন মনেই এ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। ছোটবেলায় ঘুম পাড়ানোর সময় মা পাশে বসে যে ছড়া বলতেন তা লোকসাহিত্যরই সৃষ্টি। লোকছড়া শিশুর মনে কল্পনার রাজ্য সৃষ্টি করে, যা শিশুকে সাহসী করে এবং আনন্দ দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশের হারানো লোকছড়াগুলোকে ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ নামক গ্রন্থে একত্রিত করেছেন। যেমন :‘খোকন খোকন ডাক পাড়ি/ খোকন মোদের কার বাড়ি। আয় রে খোকন ঘরে আয়/ দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।’, ‘আয় আয় চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে যা।/ চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’

মানুষ মনের সুখে গান গেয়ে লোকগীতির সৃষ্টি করেছে। খেয়া পারাপারের সময় মাঝির মুখের গান, ধানকাটা বা রোপণের সময় কৃষকের মুখের গানই লোকগীতি। জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা, রাখালি, মারফতি গান লোকগীতির অন্যতম সৃষ্টি। যেমন :‘মনমাঝি তোর বৈঠা নে রে/ আমি আর বাইতে পারলাম না।’ কিংবা  ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই/ কত রব আর পন্থের দিকে চাইয়া।’ বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে গীতিকা। মহুয়া, দেওয়ানা মদিনা, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, ইত্যাদি অন্যতম গীতিকা। এসব গীতিকা দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে গাওয়া হতো। যার আলাদা নিজস্ব নাটকীয়তা, সুর ও ভঙ্গিমা রয়েছে। মহুয়া পালার দুই চরণ, ‘কোথায় পাব কলসি কন্যা কোথায় পাব দড়ি/ তুমি হও গহিন গাঙ্গ আমি ডুব্যা মরি।’ ড. দীনেশচন্দ্র সেন দেশের হারানো গীতিকাগুলোকে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামক গ্রন্থে সংকলন করেছেন। যে কাহিনি মুখে বর্ণনাত্মক, যার মধ্যে লৌকিক ও অলৌকিক ঘটনা রয়েছে, যার পরিধি আকাশপাতাল জলস্থল অতিক্রমণীয় এবং জাদুশক্তি বা দৈবশক্তির প্রভাব বিদ্যমান থাকে এসবই লোককাহিনি। যেমন : ঠাকুরমার ঝুলি। এছাড়া সাধারণ মানুষের অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় ধাঁধায়। বুদ্ধিদীপ্ত, সৌন্দর্যবোধ, রসিকতা, চিন্তার উৎকর্ষ সাধন ধাঁধার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। জ্ঞানচর্চার অন্যতম মাধ্যম ছিল এই ধাঁধা। যেমন :বাগান থেকে বেরোলো টিয়ে/ সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। উত্তর :আনারস। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধ জ্ঞানকে অল্পকথায় প্রকাশ করা হয়েছে প্রবাদের মাধ্যমে। এজন্য প্রবাদকে বলা হয় বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস। যেমন :অতি লোভে তাঁতি নষ্ট, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, পেটে খেলে পিঠে সয়, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে ইত্যাদি। জ্যোতিষশাস্ত্র-বিষয়ক ডাকের বচন ও কৃষিবিষয়ক খনার বচন লোকসাহিত্যের অন্যতম সৃষ্টি। যেমন :‘আউশ ধানে চাষ লাগে তিন মাস, শ্রাবণের পুরো, ভাদ্রের বারো। ধান্য রোপণ করো যত পারো।’, ‘সরিষা সাথে মুগ-মুসুরি বুনাইয়া কর বাবুগিরি।’

লোকসাহিত্য বাংলার অমূল্য সম্পদ। লোকসাহিত্যের চর্চা ও সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। বর্তমানে আধুনিকতায় লোকসাহিত্য একরকম হারিয়েই যেতে বসেছে। অথচ লোকসাহিত্য আমাদের সংস্কৃতির পরিচায়ক, আমাদের শেকড়। লোকসাহিত্যকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। লোকসাহিত্যের সঠিক চর্চার মাধ্যমে তা বাঁচিয়ে রাখতে হবে প্রাত্যহিক বাঙালি জীবনে এবং লোকসাহিত্য সংরক্ষণ করার জন্য গবেষণাকর্ম, সংগ্রহ কাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

লেখক : শিক্ষার্থী, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন