বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সুরক্ষিত হোক ওজোন স্তর 

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:১০

সবুজের সমারোহে আচ্ছাদিত এই পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন প্রবহমান রাখতে ওজোন স্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বায়ুমণ্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত ওজোন স্তর, যা এই ভূপৃষ্ঠ থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান। ওজোন স্তর সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পৃথিবীর উদ্ভিদ ও প্রাণিজগেক রক্ষা করে। ওজোন স্তরের সুরক্ষামূলক আচ্ছাদনের ফলে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব চলমান থাকা সম্ভব। তাই তো ওজোন স্তরকে প্রাকৃতিক সৌরপর্দা বা ন্যাচারাল সানস্ক্রিন বলে। পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডলের স্তরগুলোর মধ্যে ওজোন একটি স্তর, যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি মাত্রায় ওজোন গ্যাস থাকে, এমনকি বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

১৯৩০ সালে ফরাসি পদার্থবিদ চার্লস ফ্যেব্রি ও হেনরি বুইসন ওজোন স্তর আবিষ্কার করেন। বায়ুমণ্ডলে তাপ উত্পাদক বিক্রিয়ায় অক্সিজেন পরমাণুর সঙ্গে অবিয়োজিত অক্সিজেন অণুর রাসায়নিক সংযুক্তির ফলে সৃষ্টি হয় ওজোন এবং তা থেকে গঠিত হয় ওজোন গ্যাসের স্তর। ওজোন স্তরের মধ্যে রয়েছে অক্সিজেনের তিনটি পরমাণু। অন্যদিকে অক্সিজেনে রয়েছে এই পরমাণুর সংখ্যা দুই।

ওজোন স্তরের আচ্ছাদনের ফলে সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে আসতে পারে না। ফলে প্রাণিকুলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথ সুগম হয়। বায়ুমণ্ডলীয় তাপের ভারসাম্য বজায় রাখতে ওজোন স্তর মুখ্য ভূমিকা রাখে। তাছাড়া দুরারোগ্য ত্বকের ক্যানসার, চোখে ছানিপড়া, প্রজনন ক্ষমতার হ্রাসকল্পে ওজোন স্তর (ঙুড়হব ষধুবত্) সহায়ক। অন্যদিকে পৃথিবীপৃষ্ঠে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রেখে বসবাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে ওজোন স্তর অনবদ্য ভূমিকা রাখে।

বৃষ্টিমুখর সময় হাতে রাখা ছাতায় যদি অসংখ্য ছিদ্র থাকে, তাহলে কতটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির তৈরি হবে? ঠিক তেমনি পৃথিবীতে ওজোন স্তরের ক্ষয় বা ছিদ্র হলে পরিবেশ ও জলবায়ু হুমকির সম্মুখীন হবে। সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও উন্নত জীবন ধারণের নিমিত্তে আমরা অবচেতনভাবে ওজোন স্তরকে হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছি। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি বছর ওজোন স্তর তার আয়তনের ৪ শতাংশ হ্রাস পাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জলবায়ু ও পরিবেশ ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। অগ্নুৎপাত, বজ্রপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক ঘটনায় ওজোন স্তরের ক্ষয় হলেও মনুষ্যসৃষ্ট ঘটনা আরো দ্বিগুণ ভয়াবহ। ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (ঈঋঈ), হ্যালোন গ্যাসের নির্গমন, সালফেট যৌগের প্রভাব এবং স্ট্রাটোস্ফিয়ারে চলাচলকারী বিমান মনুষ্যসৃষ্ট কারণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সিএফসি হিমায়ক দ্রব্যরূপে রেফ্রিজারেটর, হিমঘর, এয়ারকন্ডিশন প্রভৃতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রসাধনী, বডি স্প্রে, হেয়ার কন্ডিশনার তৈরিতে সিএফসি প্রয়োজন। এছাড়াও ক্লোরোফ্লুরোকার্বন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ধুলোময়লা পরিষ্কার করার জন্য দ্রাবক হিসেবে কাজে লাগে।

ওজোন স্তরের ক্ষয়ের ফলে বরফ গলতে শুরু করবে, যা আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রূপ ধারণ করবে। দুরারোগ্য ব্যাধির সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিজগতের বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে। এছাড়াও প্রাণীর প্রজননক্ষমতা ও গড় আয়ু হ্রাস পাবে। সবুজ অরণ্য, খাদ্যশস্য ও ফলমূলের উত্পাদন ক্রমান্বয়ে কমে আসবে।

এই পৃথিবীটা আমাদের। সুতরাং পৃথিবীকে বসবাস যোগ্য করে তোলার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। ওজোন-স্তরের প্রাকৃতিক কারণগুলো প্রতিহত করা সম্ভব না হলেও মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলো প্রতিহত করতে হবে। সচেতনতার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষণ দিবস পালন করে আসছে। এই উদ্যোগে শামিল হতে সবাইকে উদ্বেগজনক হারে ওজোন স্তর ক্ষয় রোধকল্পে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী পদার্থসমূহের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ওজোন স্তর ক্ষয়কারী পদার্থসমূহের পুনর্ব্যবহার, ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগের বিকল্প উদ্ভাবন, ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থসমূহের নির্গমন রোধ ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। ওজোন স্তর ক্ষয়রোধ নিয়ন্ত্রণ হোক, প্রাণের স্পন্দন অবিরত চালু থাকুক। পৃথিবীটা হয়ে উঠুক বসবাসযোগ্য। 

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন