সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিত্তের পেছনে ছুটে চিত্তকে কলুষিত করছি না তো?

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৩০

ভালোভাবে চলতে গেলে বিত্তের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বিত্তের জন্য চিত্ত যেন কলুষিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আজকাল সমাজে যারা বিত্তবান তারাই বেশি সম্মানিত। কিন্তু মানুষের বিত্ত চিরকাল স্থায়ী হয় না। আজ যে লাটসাহেব সেও একদিন রাস্তার ফকির হতে পারে। আবার অর্থবিত্ত না থাকায় সমাজে যে ব্যক্তিটি সবচেয়ে অবহেলিত সেও একদিন হয়ে উঠতে পারে বিত্তবান। কাজেই মানুষকে তার বিত্ত অনুযায়ী মূল্যায়ন না করে তার চিত্ত কতটা সুন্দর তা দেখে তাকে চিনি! চিত্ত যার সুন্দর সে হবে সমাজে আদৃত। চিত্তের উন্নয়ন না করে শুধু টাকা-পয়সা, অর্থসম্পদ উপার্জনের পেছনে ছুটলে সে বিত্ত জীবনে সুখ-শান্তির পরিবর্তে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পৃথিবীতে যারা সমাদৃত হয়েছেন তাদের এ আদৃত  হওয়ার পেছনে রয়েছে তাদের মহৎ ও সুন্দর চিত্ত। তারা তাদের সুন্দর চরিত্রের কারণে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন চিরকাল। কিন্তু যারা বিত্তের ঐশ্বর্যে নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর মাটিকে করেছে রক্তাক্ত, শান্তিকামী মানুষের উপর চালিয়েছে জুলুম-নির্যাতন তাদের নাম তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মুছে যায়, তাদের কথা কেউ সরণ রাখে না, রাখলেও তারা ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকে। তাদের নামে নাম রাখতে মানুষ লজ্জাবোধ করে। প্রিয় পাঠক আমরা দেখি বিত্ত থাকলেই মানুষ সুখী হতে পারে না। দেখা যায় অনেক টাকা-পয়সার মালিক দুশ্চিন্তায়, হতাশায় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তারা তাদের নিজ পরিবারেও অবহেলিত হয়। অন্য দিকে একজন রিকশাচালক, দিনমজুর সারা দিন পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে চলতে তার একটু টানাপড়েন হলেও তিনি রাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারেন, পরিবারের সবার সঙ্গে আনন্দে যায় তার দিনগুলো। কারণ তাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো আকাশচুম্বী নয়। অল্পতেই তারা সন্তুষ্ট থাকে। 

পত্রিকার পাতা ধর্ষণ, হত্যা, দুর্নীতির খবরে ঠাসা থাকলেও মাঝে মধ্যে কিছু সংবাদ আমাদের আশাবাদী করে। যেমন—কিছুদিন আগে একটি পত্রিকার হেডলাইন ছিল—‘ষাটোর্ধ্ব ভিক্ষুক জাপটে ধরলেন ছিনতাইকারীকে।’ একজন মহিলার গলার সোনার চেইন নিয়ে চম্পট দিয়েছিল ছিনতাইকারী। ছিনতাইকারীকে ধরতে এগিয়ে এসেছিলেন একজন বয়স্ক মানুষ। আজকাল রাস্তাঘাটে যেখানে একজন মানুষের বিপদে অন্যরা নীরব থাকে সেখানে তিনি তার চিত্তের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সত্সাহস থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়। অন্য দিকে একজন রিকশাচালকের কথা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি। যিনি তার রিকশায় একটি আইফোন পেয়েছিলেন এবং সেটি তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেন। রিকশা চালিয়ে সামান্য কয়টা টাকা উপার্জন করলেও তার চিত্ত কিন্তু অনেক বড়। তাই তিনি এ কাজটি করতে পেরেছেন।

বিত্তের পাশাপাশি চিত্ত মহত্ হলে আপনি সমাজে অনেক ভালো কাজ করতে পারবেন। ধরুন আপনার এলাকায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা অর্থের অভাবে লেখাপড়া চালিয়ে নিতে হিমশিম খায়। আপনি কিন্তু চাইলে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। আমাদের চারপাশে অনেক পরিবার রয়েছে যেখানে স্কুলগামী মেয়েটি বাবার অর্থের টানাপড়েনের কারণে তার প্রতিটি দিন কাটে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। আপনি চাইলে তাকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দিতে পারেন তাহলে সে নিজেও স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পাবে, পাশাপাশি সংসার চালিয়ে নিতে বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারবে সে। আমাদের চারপাশে অনেক বেকার যুবক রয়েছে, আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের দু-একজনকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করলেন, এতে সমাজ থেকে বেকারত্ব দূর না হলেও আপনার দেখাদেখি হয়তো অন্যরাও (বিত্তবান) এ মহৎ কাজে এগিয়ে আসবে। 

বিত্ত-বৈভব বেড়ে গেলে অনেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করে থাকে। নিজের স্ট্যাটাস কমে যাবে বলে অনেকে এড়িয়ে চলেন তাদের কাছের মানুষজনকে। অথচ তাদের কোলেপিঠে করে বড় হয়ে তিনি আজকের অবস্থানে আসতে পেরেছেন। অনেকে বিত্তের পেছনে ছুটে চিত্তকে করেন কলুষিত। তখন তারা আর ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনা না করেই অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। মানুষকে ঠকিয়ে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে, ঘুষ, দুর্নীতির টাকায় আঙুল ফুলে কলা গাছ হয় যান। বিত্তের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্মান বেড়ে গেলেও সে সম্মান বেশি দিন টেকে না। অবৈধভাবে বিত্তবান হওয়ার রহস্য মানুষের সামনে ফাঁস হয়ে গেলে তারা হয়ে ওঠেন সবচেয়ে নিন্দিত ও ঘৃণিত। অথচ অর্থ উপার্জনের জন্য কত সৎ পথ খোলা রয়েছে। 

বিত্তের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের কথাই ভুলে যায় অনেকে। নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটু সময় কাটানো, তাদের নিয়ে  কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব যেন অনেকের মনেই আসে না। তাই তো স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসার পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। বিত্ত যদি চিত্তে প্রশান্তি না দিয়ে বরং পেরেশানিতে রাখে তাহলে সে বিত্তের জন্য কেন জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছি! অল্পতে সুখী হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। জীবনটা ক্ষণস্থায়ী। আপনি চলে যাবেন কিন্তু সঙ্গে করে এ অর্থবিত্ত, সম্পদ নিয়ে যেতে পারবেন না। এগুলো ফেলে রেখেই আপনাকে বিদায় নিতে হবে নশ্বর এ পৃথিবী থেকে। তবে কেন দেশমাতৃকার কথা, মানুষের কথা চিন্তা না করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে নষ্ট করছি দেশের ইমেজ? 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

ইত্তেফাক/ইআ