দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে শীতলক্ষ্যা

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:০১

দখল-দূষণসহ নানা কারণে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা এখন অস্তিত্ব সংকটে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার মূলগাঁও এলাকার শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী দেশের খ্যাতনামা একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কাঁচামাল বহনকারী অসংখ্য মালবাহী জাহাজ নদীতে যত্রতত্র নোঙর করে রাখা হয়েছে। দেখে যে কারো মনে হতে পারে নদীটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির ব্যক্তিগত সম্পদ।

শুধু যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদনহীন জেটি ব্যবহার তা নয়, তারা প্রতিযোগিতা করে এ নদীকে দূষণও করছে সমানভাবে। কারো কারো ইটিপি থাকলেও বেশি মুনাফার আশায় তা বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখে। তবে প্রশাসনের অভিযানের খবরে সচল হয় তাদের ইটিপি। দূষণে পিছিয়ে নেই নদীপাড়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা গ্রামগুলোর মানুষও। দূষণ ছাড়াও শীতলক্ষ্যা ব্যাপকভাবে বেদখল হয় যাচ্ছে। স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তিপর্যায়েও নদী দখল করা হচ্ছে। 

শীতলক্ষ্যা পাড়ের বাসিন্দা কালীগঞ্জ পৌর এলাকার বালীগাঁও গ্রামের মৃত সুবানি মণ্ডলের ছেলে বিষ্ণু মণ্ডল জানান, ‘শীতলক্ষ্যায় মাছ ধরে আমার বাপ-দাদারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। বংশ পরম্পরায় সেই পেশাকে এখন আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। কারণ নদীপাড়ের শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে গেছে। তাই আগের মতো আর শীতলক্ষ্যায়  মাছ পাওয়া যায় না। কালীগঞ্জ খেয়া ঘাটের মাঝি, নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের ইসলামপাড়া গ্রামের মো. বাচ্চু মিয়ার ছেলে মো. বকুল মিয়া বলেন, ১৯৮৮ সাল থেকে শিশু বয়সের এই শীতলক্ষ্যার বুক চরে বেড়াচ্ছি। এক সময় শীতলক্ষ্যা অনেক বড় ছিল। কিন্তু দিনে দিনে দুই পাড়ের শিল্পকারখানাগুলো অবৈধভাবে দখল করার ফলে নদী ছোট হয়ে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে একদিন হয়তো শীতলক্ষ্যার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাবে না।’   

স্থানীয়রা বলেন, নিজেদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নদী ও নদীর পানিকে ব্যবহার করলেও নদীর প্রতি তারা কোনো দায়িত্ব পালন করছে না। তাই নদী তীরবর্তী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইটিপি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদী পাড়ে ওয়াকওয়ে  নির্মাণ করতে হবে। 
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসক জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি একই সঙ্গে তিনি জেলা পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক। জেলা প্রশাসক পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অফিস, কৃষি অফিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআরডিবি, পরিবেশবাদী, জনপ্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যমের  প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নদী রক্ষার কাজকে এগিয়ে নিতে হবে। তাছাড়া, জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০, পানি আইন ২০১৩, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ কঠোর প্রয়োগে সুফল আসতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।    

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা নদী রক্ষী কমিটির সভাপতি মো. আসসাদিকজামান বলেন, সরকার সারাদেশে নদীর যে স্বাভাবিক প্রবাহ, তা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে নদী খননের কার্যক্রমও রয়েছে। এছাড়াও নদী রক্ষায় আলাদা করে নদী রক্ষা কমিশন ও বিআইডব্লিউটিএ আলাদাভাবে নদী নিয়ে কাজ করছে। নদীকে অবশ্যই রক্ষা কতে হবে।  তিনি আরো বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী শিল্প-কারখানাগুলোর ইটিপি নিশ্চিত করতে কাজ করছি। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরও কাজ করছে। ইটিপির বাইরে যদি কেউ ময়লা পানি বর্জ্য নিঃসারণ করে, সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

ইত্তেফাক/ইআ