বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও কোটা পদ্ধতি

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:২০

চলতি বছরে দেশের সব পাবলিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছেন। দীর্ঘ আট-নয় মাস কঠোর পরিশ্রম করে, হাজার হাজার টাকা খরচ করে পড়াশোনা করে ভালো পরীক্ষা দিয়েও চান্স অনিশ্চিত। এর প্রধান কারণ হলো ভর্তিতে কোটা পদ্ধতি। এই কোটাপ্রথা নিয়ে সমালোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে একটি আসনের বিপরীতে যখন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে প্রতিযোগিতা করতে হয়, তখন শুধু পাশ করেই কোটা দিয়ে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন। এই বৈষম্যের সুযোগ নিয়ে মেধাবীদের বঞ্চিত করে গড়পড়তা শিক্ষার্থীরাও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোয় ঢুকছেন। 

২০২২-এর ভর্তি পরীক্ষায় আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, গত ২৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক শাখা, অর্থাৎ ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আমার সিট স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ভবনের ৩৩৩ নম্বর কক্ষে পড়েছিল। যথাসময়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। আমার পেছনের বেঞ্চে এক সহপাঠী এসে বসেই তার পাশের জনকে বললেন, ‘আজকের পরীক্ষায় তোমার কত মার্কের টার্গেট?’ প্রত্যুত্তরে পাশের জন বললেন, ‘মোটামুটি ৮০ পেলে ভালো সাবজেক্ট আশা করা যায়।’ এটা শুনে পাশের জন আবার বললেন, ‘আমার শুধু পাশ মার্ক, অর্থাৎ ৩০ হলেই চান্স নিশ্চিত। কারণ আমি কোটায় আবেদন করেছি।’ আমি পরীক্ষা শুরুর অপেক্ষা করছিলাম এবং তাদের কথাবার্তা শুনছিলাম। সত্যি বলতে, এসব শুনে আমার পরীক্ষা দেওয়ার মানসিকতাই আর ছিল না।

গত জানুয়ারির ১৩ তারিখ এইচএসসির ফল প্রকাশ করার পর থেকে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছি। আর পরীক্ষা দিতে বসেছি জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে। এই কয়েকটা মাস কতটা পরিশ্রম, মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে, সেটা শুধু একজন পরীক্ষার্থীই বুঝবেন। একজন ছাত্র এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দিয়ে ৭০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পরেও যদি চান্স অনিশ্চিত হয় আর কেউ নামমাত্র নম্বর পেয়ে চান্স পায়, এটার দুঃখ ও যন্ত্রণা চান্স না পাওয়ার থেকেও বেশি। চান্স না পাওয়ার যন্ত্রণা, আত্মীয়স্বজনের কটু কথা, পরিবারের মন খারাপ ইত্যাদি মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থী কখন আত্মহত্যা বা বিপথগামী হয়, সেটা এবার ভালোভাবেই বুঝেছি। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এ’ ইউনিটে এবার সিটের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯০০। এর বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছেন প্রায় ৬৩ হাজার শিক্ষার্থী। এক সিটের জন্য পরীক্ষায় লড়ছেন ৩৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে আবার বিভাগ পরিবর্তনকারীদের জন্যও কিছু সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আবার গত বছরের পরীক্ষার্থী, অর্থাৎ সেকেন্ড টাইমারদের জন্যও আলাদা সিট রাখা হয়েছে। পরিসংখ্যান থেকে  বোঝাই যাচ্ছে কতটা কঠিন প্রতিযোগিতা হয়েছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক সিট বিভিন্ন কোটার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। তাহলে এটাকে প্রতিযোগিতা কীভাবে বলা যায়! এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও গত কয়েক বছর ধরে একটা নিয়ম চলে আসছে, সেটা হলো মেয়েদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। দেশের সমাজবাস্তবতায় ক্ষেত্রবিশেষে কোটাপ্রথা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা কারা পাবেন, সে বিষয়ে আরো চিন্তাভাবনা করা উচিত। সংবিধানে শুধু পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কোটার কথা বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া বলতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা রাখা যৌক্তিক। অন্যগুলো কতটা যৌক্তিক, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। 
 
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনও যে পোষ্য কোটা রেখেছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ সংবিধানে কোটা শুধু পিছিয়ে পড়াদের জন্য রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন দিক থেকে পিছিয়ে পড়া, আমি প্রশ্ন রাখতে চাই। ঠিক কোন যুক্তিতে, কোন আইনের বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাকরিরতদের সন্তানদের এই ‘অনৈতিক’ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা নেই। পোষ্য কোটায় আসা এসব ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ করে সেখানেই শিক্ষক হচ্ছেন, কর্মকর্তাও হচ্ছেন, যে কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন পরিবারতন্ত্রের কবলে পড়েছে। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে। সব শিক্ষার্থীর সমাধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে কখনোই এটা সুষ্ঠু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হতে পারে না। অযোগ্য অদক্ষদের সুযোগ দিয়ে যোগ্য ও মেধাবীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই কোটা নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় জাতি গঠনের প্রশিক্ষণ মাঠ। আশা করি, ইউজিসি ও শিক্ষকগণ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন। 
লেখক :শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন