সম্প্রতি এক ব্যক্তি দুই বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ বিজ্ঞাপনে শুধু ভাতই নয়, মিলেছে একটা চাকরির। চাকরিটা পেতে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমগুলো। যাহোক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাই এজন্য যে, একজন বেকারের কর্মস্থান করা হয়েছে। তবে এর মধ্য দিয়ে আমরা কী বার্তা পেলাম? বাস্তবিক অর্থে, লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণের মনে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে এই ভদ্রলোকের মাধ্যমে। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, এদেশের শহরগুলোর অলি-গলিতে বেকারের উপচে পড়া ভিড়। তরুণ সমাজের একটা বড় অংশই আজ মহাসংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। ‘বেকার’ বিশেষণটি নামের আগে যুক্ত থাকার কারণে একজন শিক্ষিত তরুণ তার শিক্ষা, মেধা, জ্ঞানের জন্য প্রাপ্য মর্যাদাটুকু হারাচ্ছে রাষ্ট্রে, সমাজে, এমনকি পরিবারের কাছেও। এই বেকার বিশেষণে বিশেষায়িত দেশের ৪৭ শতাংশ শিক্ষিত তরুণ, যা বাংলাদেশর মোট জন সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, ৪ কোটি ৭৪ লাখ তরুণের বসবাস এই ছোট্ট ভূখণ্ডে। দেশ গঠনে যেখানে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন দেশের তরুণরা, সেখানে এদেশের তরুণদের বড় অংশই এগোচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এমনকি অনেক তরুণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত বেছে নিতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
বাংলাদেশ একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। এ দেশকে মধ্যবিত্তের খনি বললেও ভুল হবে না। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষিত সন্তানকে ঘিরে নানা স্বপ্ন সাজায়। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পর যখন তাদের বেকার জীবন পার করতে হয়, তখন পরিবারের স্বপ্নগুলো পরিণত হয় ‘বড় বোঝায়’।
সত্যিকার অর্থে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তরুণরা যত বেশি শিক্ষিত হচ্ছে, তত বেশি বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়েছে, প্রশান্ত ও উপসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬.৮ শতাংশ; এরপরেই বাংলাদেশের অবস্থান ১০.৭ শতাংশ, যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্য দিকে, আইএলওর প্রতিবেদন বলছে, ৩ কোটি বেকারের বসবাস এই ভূমিতে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বৈকি! আইএলও আভাস দিয়েছে কয়েক বছরের মধ্যে ৬ কোটিতে পৌঁছাবে এ সংখ্যা। যা গিয়ে দাঁড়াবে মোট জনসংখ্যার ৩৯.৪০ শতংশে। প্রতি বছর ২২ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। তারমধ্যে ৭ শতাংশ তরুণ চাকরি পাচ্ছে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বেকারত্বের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
মোটদাগে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, দুর্নীতির কাছেও হেরে যাচ্ছে দেশের লাখ লাখ মেধাবী তরুণ। সাম্প্রতিক দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, সরকারি পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে সমাজকর্মী নিয়োগেও প্রশ্ন ফাঁস এবং লাখ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটাতো সাম্প্রতিক উদাহরণ। কিন্তু দেশে এরূপ অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে আসছে বহু বছর আগে থেকে এবং এখনো অহরহ চলছে। এভাবে চলতে থাকলে মেধাবীদের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে কীভাবে!
এ কথা বলাই যায়, আয়াতনের তুলনায় জনবহুল দেশ আমাদের। এদেশে কর্মসংস্থানের অভাব হবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাড়তি জনসংখ্যা কি অভিশাপ? না। মোটেও না, জনসংখ্যা আশীর্বাদ। বিশ্বের অনেক জনবহুল দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টকে কাজে লাগিয়ে মাথা উঁচু করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা বিশ্ব। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা মানবসম্পদকে মানববোঝায় রূপান্তরিত করে চলেছি।
সুতরাং প্রত্যাশা থাকবে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ পাবে দেশের প্রতিটি তরুণ। হাসি ছড়িয়ে পড়বে গ্রাম গঞ্জের প্রতিটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। মানবসম্পদের যথার্থ ব্যবহার হবে। আর শুধু তাহলেই লাল সবুজের পতাকা ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র বিশ্বে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
