বর্তমান এই বিশ্বায়নের যুগে সাইবার দুনিয়ার সোশ্যাল সাইটকে নিরাপদ ও ইতিবাচক জায়গা মনে করে আমরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করি এবং ক্যামেরায় ধারণকৃত নিজেদের ছবি সবার সঙ্গে শেয়ার করি। যাতে করে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো স্মৃতির পটে গচ্ছিত থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সাইবার দুনিয়ার নিরাপদ ব্যবহারও যেন ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর রকমের ভার্চুয়াল হয়রানির মাধ্যমে। এই হয়রানিকে কাগজে কলমে বলা হয় সাইবার বুলিং।
ইউনিসেফের ভাষ্যমতে, ডিজিটাল মাধ্যম (ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল, লিংকডইন ইত্যাদি) ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি বা উত্ত্যক্ত করাই সাইবার বুলিং। উত্ত্যক্তকারীরা কোনো এক ব্যক্তিকে নিশানা করে ভয় দেখায়, রাগায়, লজ্জা দেয়, আবার কখনো-বা তার সর্বস্ব কেড়ে নেয়। বলা চলে সবচেয়ে বেশি তরুণ প্রজন্মই এ ধরনের সাইবার ফাঁদের নিয়ন্ত্রণকারী, একই সঙ্গে তারা ভুক্তভোগীও বটে। নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, তাদের মধ্যে সাইবার প্রতারণার মনোভাব তৈরিতে অনেক বড় এবং শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে কোভিড-১৯-এর সময়কাল। এ বিষয়ে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভয়াবহ করোনা মহামারির সময় তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ লকডাউনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে তাদের মধ্যে অনলাইন আসক্তিসহ ডিজিটাল প্রতারণার জন্ম হয়। পরবর্তী সময়ে তারা তাদের সমবয়সি পরিচিত কোনো বন্ধুবান্ধব বা অপরিচিত কাউকে সেই ফাঁদে আটকিয়ে নিজেদের স্বার্থ মেটানোর চেষ্টা করে।
সাইবার হয়রানি সংঘটিত হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ দায়ী। যেমন : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া, চলমান পরীক্ষা বাতিল হওয়া, সেশনজট, দারিদ্র্যতা, পারিবারিক সংকট, ক্যারিয়ার গঠনের চাপ এবং অনলাইন ক্লাসের নামে অতিরিক্ত সময় অবাধে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ, একাকীত্ব, দুশ্চিন্তা, একঘেয়েমি ইত্যাদি। এসব কারণে তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ লকডাউনে আবদ্ধ থেকে সাইবার বুলিং করার সুযোগ পেয়েছে। চলতি বছর সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) গবেষণা অনুসারে, সাইবার অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশই ভুগছেন সাইবার বুলিংয়ের কারণে এবং এদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে, দেশের তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করেই সাইবার হয়রানিসংক্রান্ত অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছেলেদের থেকে মেয়েরা সব থেকে বেশি সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছে। ২০২১ সালে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, টাকা না দিলে অন্তরঙ্গ ছবি/ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়াসংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে ছেলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ২৩, অন্যদিকে মেয়ের সংখ্যা ছিল চার গুণের বেশি, সংখ্যায় ১০০। ভুয়া আইডি থেকে বাজে মেসেজ-সংক্রান্ত বিষয়ে ভুক্তভোগী ছেলের সংখ্যা ছিল ৪৯, মেয়ের সংখ্যা ছিল ১০০। উল্লেখ্য, ছেলের সংখ্যা ছিল বেশি আইডি হ্যাকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণাসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে।
প্রতিনিয়ত ভুক্তভোগীরা মেসেঞ্জারের ইনবক্স খুললেই মানসিক ধাক্কা খাচ্ছেন নোংরা ছবি, নোংরা আলোচনা, বাজে মেসেজিং দেখা মাত্রই। নিয়মিত তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমন ডিজিটাল হয়রানিমূলক আচরণ তাদেরকে মানসিক যন্ত্রণার সাগরে ফেলে দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে সাইবার বুলিং নামক এমন সামাজিক ব্যাধি থেকে তরুণ প্রজন্মকে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পরিবারের এবং সমাজের। পরিবারের উচিত সমাজের কোন কমিউনিটিতে এবং কোথায় সাইবার বুলিং হয় সেগুলো শনাক্ত করা। একই সঙ্গে সন্তানেরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—সেগুলো খেয়াল রাখা। এছাড়াও শিক্ষকদের দায়িত্ব অনলাইন জগতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাখার জন্য সামাজিক সংগঠন বা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ তাদের মধ্যে তৈরি করা এবং শিক্ষামূলক টুলস ব্যবহারে তাদের উত্সাহী করা, ডিজিটাল লাইফের উপকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাদের গাইডেন্স প্রদান করা। এগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের উচিত সাইবার হয়রানিতে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা। কারণ প্রায় ৭৩ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। সর্বোপরি, সাইবার প্রতারণা বা বুলিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। যেটা দেখে অন্যরা যেন এই অপরাধ সংগঠনের চিন্তাও না করে। তাহলেই তরুণ প্রজন্মকে সাইবার বুলিংয়ের জাঁতাকল থেকে বাঁচানো সম্ভব।
লেখক :শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

