ফাটল সংস্কার নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২২, ০০:৩০

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অতিবৃষ্টির পূর্বাভাসে যখন আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংকেত জারি হয়, তখনই শুরু হয় উপকূলের বোবা কান্না; যে কান্না বিগত কয়েক বছর ধরে কেঁদে আসছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। তবে তাদের এই কান্না আর বুকফাঁটা আর্তনাদ আজও হয়তো পুরোপুরিভাবে পৌঁছায়নি দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে। আর কান্নার জলের কিছু অংশ ভাসতে ভাসতে সে পর্যন্ত পৌঁছালেও এর মূল্য বোঝেননি নীতিনির্ধারণী মহলের অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণে প্রতি বছর কোনো না কোনো ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাস হানা দিচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে। বছরের এই মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা কারণে সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি হয় উপকূলীয় এসব জনপদে। সবশেষ চলছে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের বিধ্বংসী প্রভাব। সিত্রাংয়ের প্রভাবে গতকাল উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হবে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে বিভিন্ন এলাকায় গতকাল বৃষ্টিপাত হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত ৭ নম্বর বিপত্সংকেত দেওয়া হয়েছে। এই সংকেতের মধ্য দিয়ে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি আর নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কানায় কানায় ভরে উঠেছে। এর মধ্যেই খুলনার কয়রা উপজেলার হরিণখোলা বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন, জনপ্রিনিধিরা সেই ভাঙন বাঁধে সংস্কার করেছেন। তবে টেকসই বেড়িবাঁধ না হলে তা আবারও যেকোনো সময় জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেড়ে এলাকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করবে। এতে কয়েকটি গ্রাম, ফসলের খেত, বাড়িঘর, মৎস্য ঘের প্লাবিত হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলায় পাউবোর ১৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার মধ্যে ২১ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১২ কিলোমিটার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে টলমল অবস্থায় রয়েছে।

এদিকে সাতক্ষীরা উপকূলে পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ ও ২-এর আওতায় মোট বেড়িবাঁধ আছে ৭০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৫ পয়েন্টে ২০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়  সিত্রাংয়ের খবরে বিশেষ করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ইয়াশ, আম্ফানে বিধ্বস্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনিসহ ঐ জনপদের উপকূলবাসী। এ বছরও শ্যামনগরের বেড়িবাঁধে ২২টি স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। শ্যামনগরের পদ্মপুকুরের খুঁটিকাটা, প্রতাপনগর, আনুলিয়া, শ্রীউলা, গাবুরা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ওপর আঘাত হানলে বছর না ঘুরতেই আবারও চরম বিপর্যয়ে পড়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা অতিক্রম করবে। আবারও শুরু হবে আইলা, আম্ফানের মতো মানবেতর জীবনযাপন। আগের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবার এমন বিপর্যয় তাদের সর্বস্বান্ত করে ফেলবে। ছোট ছেলেমেয়ে, পরিবারের বৃদ্ধদের নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরিত করতেও বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হবে তাদের। প্রায় এক যুগ আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় বিধ্বস্ত উপকূলের এসব অঞ্চলের মানুষ আজ অব্দি খাওয়ার পানির সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর ওপর অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে জলাবদ্ধতায় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এলাকায় লবণপানির প্রভাবে এবং সুপেয় পানির উৎস না থাকার কারণে উপকূল অঞ্চলের মানুষ খাওয়ার পানির চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। এর কারণে তারা টাইফয়েড জ্বর, রক্ত আমাশয়, ডায়রিয়া, কলেরা, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব রোগ তাদের এখন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আরো বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে মানচিত্র থেকে এসব অঞ্চল অতিদ্রুত বিলীন হয়ে যাবে।

তবে এত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও তারা আশা করে পথ চেয়ে বসে আছে তাদের ঘিরে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনার দিকে। কিছুদিন আগে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় পুরোনো বাঁধ সংস্করের পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকার ‘সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার নম্বর-১৫ (শ্যামনগর) পুনর্বাসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় জেলা খুলনার কয়রা উপজেলায় একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে, যার পোল্ডার নম্বর ১৪/১। এখানে ১ হাজার ৭২ কোটি ৩১ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ দুটি বাজেটের ফলে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছেন নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া উপকূলীয় অঞ্চলের এসব মানুষ। তাই শুধু বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিলে কিংবা প্রতি বছর এই মৌসুমে বেড়িবাঁধে সামান্য সংস্কার না করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এই জনপদের মানুষকে বাঁচাতে, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে ইতিমধ্যে যে প্রকল্প দুটি পাশ হয়েছে, সেটি সুপরিকল্পিতভাবে এবং স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে উপকূল থেকে উদাত্ত কণ্ঠে আহব্বান জানাচ্ছি। 

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন