নানা সংকটে রাঙ্গাবালীর রাখাইন সম্প্রদায়

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২২, ০২:৩২

রাঙ্গাবালীতে রাখাইন সম্প্রদায় বিলুপ্তির পথে। এই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বর্তমানে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। ইতিহাসের তথ্যানুসারে, ১৭৮৪ সালে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে রাখাইনদের আগমন ঘটে। তৎকালীন বার্মিজ রাজা বোদোপয়া আরাকান রাজ্য জয় করেন। তার জয়লাভের কারণে ভয়ে অনেক রাখাইন পালিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবেশ করে। রাখাইনদের ক্যাপ্টেন প্যোঅং, উঃগোম্বাগ্রি ও অক্যো চৌধুরীর নেতৃত্বে তাদের সঙ্গে করে আনা ধান ও ফলমূলের বীজ বপন করে জমি আবাদ শুরু করে এবং এই রাঙ্গাবালীর দ্বীপে তারা বসতি স্থাপন করে। 

সমাজসেবা অফিসের তথ্যমতে, পালি শব্দ ‘রক্ষা’ থেকে ‘রাখাইন’ শব্দের উৎপত্তি বলে রাখাইন ইতিহাসবিদরা মনে করেন। প্রথমে এদের বলা হতো রক্ষাইন, যার অর্থ রক্ষণশীল জাতি। আরাকানের মেঘবাতির সান্ধ্যে জেলা থেকে ১৫০টি পরিবার ৫০টি নৌকাযোগে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে রাঙ্গাবালী দ্বীপের সন্ধান পায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে দুটি সোতে রাখাইনদের উপকূলীয় অঞ্চল রাঙ্গাবালীতে আবাস পরিলক্ষিত হয়েছে। যাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যগত পরিচয়, যা তাদের অন্যদের থেকে পৃথক করে। একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ধারণ, লালন-পালনের মাধ্যমে রাখাইনরা নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বহন করে বাংলাদেশের বসবাস করলেও তাদের ‘জাতি-উপজাতি’, ‘মগ-মারমা-রাখাইন’ নামে অভিহিত করা হয়। স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায় মনে করে, জাতি-উপজাতির বিতর্ক থেকে বেরিয়ে রাখাইন সম্প্রদায় একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী, যারা বার্মিজ নয়, আবার তারা মারমা বা মগও নয়। রাখাইনদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত পরিচয় সম্পর্কে ধারণা, নিজস্ব পরিচয় থাকা সত্ত্বেও যে পরিচয়-সংকট বিদ্যমান, তার স্বরূপ উম্মোচন এবং এর ফলে সৃষ্ট তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন সমস্যা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। 

কাপড় বুননে ব্যাস্ত রাখাইন সম্প্রদায়ের নারী।

উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের তুলাতলী রাখাইন পল্লির মাতবর মাংচোনং রাখাইন বলেন, ‘পোশাকের ক্ষেত্রে রাখাইন যুবকরা সাধারণত নিজেদের তৈরি লুঙ্গি (দোয়া), শার্ট (এনজ্যি) পরে। মন্দিরে প্রার্থনা, বিভিন্ন ধর্মীয় ও লোকজ অনুষ্ঠানে মাথায় পাগড়ি পরা হয়, যা আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। অন্যদিকে মেয়েরা লুঙ্গি (থাবিং), ব্লাউজ (বেদাই-এনজ্যি), বক্ষবন্ধনী (রানজেই এনজ্যি), ওড়না (পোছো পেইন) ইত্যাদি পরে থাকে। এছাড়া সাজসজ্জায় চুলে তাজা ফুল, সোনা, রুপার টংকার, স্বর্ণের অলংকার পরতে পছন্দ করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রধান খাদ্য ভাতের সঙ্গে সামুদ্রিক মাছ যেমন—হাঙর, কাঁকড়া, সিঁসিলী (রেক্রাতি), শামুক, ঝিনুক এবং মিঠাপানির মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী—যেমন শূকর, মুরগি, কবুতর, হাঁস, ব্যাং প্রভৃতির মাংস খেতে পছন্দ করি। পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল, বাঁশ কোড়ল, বুনো ওল, ব্যাঙের ছাতা, মাশরুম, বিন্নি ভাত, পিঠে-পুলি ইত্যাদি খেয়ে থাকি। নারী-পুরুষ উভয়ে মাঝেমধ্যে হাতে তৈরি চুরুট পান করি। বর্তমান সময়ে আমাদের মধ্যে এসব খাবারের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে ক্রমাগত আমাদের জাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন গুটিকয়েক পরিবার নিয়ে আমরা বসবাস করছি।’

কাপড় বুননে ব্যস্ত রাখাইন সম্প্রদায়ের নারী।

উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু হাসানাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের তুলাতলীতে রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস। তরা সংখ্যালঘু হলেও আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। রাখাইন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমরা সামাজিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’

রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. জহির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাসকারীরা অত্যন্ত বিনয়ী। প্রতি বছর প্রবারণা পূর্ণিমায় সরকার কর্তৃক তাদেরকে অনুদান দেওয়া হয় এবং স্বধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করে থাকে। তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমরা যথেষ্ট সচেতন রয়েছি।’

 

ইত্তেফাক/ইআ