ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০০:৩০

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ক্ষত শেষ হয়নি। এরই মধ্যে শোনা গেল আরেক দুঃসংবাদ। ডিসেম্বরেই দেশে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। বন্যা, খরা, ভূমিধস, টর্নেডো, শৈত্যপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর ব্যাপক সম্পদ ও প্রাণহানি ঘটে।

ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের তথ্য বলছে, দক্ষিণ থাইল্যান্ড এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি নিম্নচাপ আন্দামান সাগরের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আগামী ২ ডিসেম্বরের মধ্যে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এবং সংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করবে। বঙ্গোপসাগরেই সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে। এরপর আরো উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করবে। পরে ৪ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সকালে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ-ওড়িশা উপকূলের মাঝামাঝি আছড়ে পড়তে পারে এটি।
সর্বশেষ, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং উপকূলে আঘাত হানার পর প্রাণহানিসহ জমির ফসল বিনষ্ট ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। জীবননাশের ক্ষেত্রে পানিতে ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি গাছচাপায় মৃত্যুর ঘটনাই বেশি। সময়মতো উপকূলবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এবারও ব্যর্থতার চিত্র দেখা গিয়েছে। এমন দুর্যোগের জন্য যেখানে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগে প্রস্তুতি নিতে হয়, সেখানে মাত্র দুদিন আগে সবাইকে সতর্ক করে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এমনকি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আগে ভাত খাওয়ার সময় কিংবা ঘরে ফেরার সময় রাস্তায় গাছ পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও দেখা গিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী সন্তানসহ পুরো পরিবারই চোখের পলকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।

নিয়মিত ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও জাতীয়ভাবে দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি যে যথেষ্ট নয়, সেটি বারবার ফুটে উঠছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণকাজে এখনো মন্থর গতি দেখা দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি অর্থবরাদ্দ হলেও মেরামতের কাজ শুরু করা হয়নি, এমন বাঁধও রয়েছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত খুলনা উপকূলের কয়রা উপজেলার হরিণখোলা ও গাতিরঘেরীর বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের নিয়ে মেরামতের কাজ চলছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হচ্ছে, দুর্যোগের সময় কোন এলাকার লোক কোন আশ্রয়কেন্দ্রে যাবে, গবাদি পশু কোথায় থাকবে, তা আগে ঠিক করে রাখুন এবং জায়গা চিনিয়ে রাখুন। বাড়িতে, গ্রামে, রাস্তায় ও বাঁধের ওপর গাছ লাগান। যথাসম্ভব উঁচু স্থানে শক্ত করে ঘর তৈরি করুন। পাকা ভিত্তির ওপর লোহার বা কাঠের পিলার এবং ফ্রেম দিয়ে তার ওপর ছাউনি দিন। ছাউনিতে টিন ব্যবহার না করা ভালো। কারণ ঝড়ের সময় টিন উড়ে গিয়ে মানুষ ও গবাদি পশুকে আহত করতে পারে। তবে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরুত্ববিশিষ্ট টিন ও জেহুক ব্যবহার করা যেতে পারে। উঁচু জায়গায় টিউবওয়েল স্থাপন করুন, যাতে জলোচ্ছ্বাসের লোনা ও ময়লা পানি টিউবওয়েলে ঢুকতে না পারে। জেলে নৌকা, লঞ্চ ও ট্রলারে রেডিও রাখুন। সকাল, দুপুর ও বিকেলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনার অভ্যাস করুন। সম্ভব হলে বাড়িতে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম (ব্যান্ডেজ, ডেটল প্রভৃতি) রাখুন। জলোচ্ছ্বাসের পানির প্রকোপ থেকে রক্ষার নানারকম শস্যের বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিন। বাড়িতে ও রাস্তায় নারিকেলগাছ, কলাগাছ, বাঁশ, তাল, কড়ই ও অন্যান্য শক্ত গাছপালা লাগান। এসব গাছ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বেগ কমিয়ে দেয়। ফলে মানুষ দুর্যোগের কবল থেকে বাঁচতে পারে।

নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে প্রত্যেকেরই সাঁতার শেখা উচিত। ঘূর্ণিঝড়ের মাসগুলোতে বাড়িতে মুড়ি, চিড়া, বিস্কুটজাতীয় শুকনো খাবার রাখা ভালো। নোংরা পানি কীভাবে ফিটকারি বা ফিল্টার দ্বারা খাবার ও ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে নারীদের এবং আপনার পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেন। এই অবস্থায় জনগণকে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঘূর্ণিঝড়ে জনগণের করণীয় বিষয়গুলো জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে ও বোধগম্য করে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন