জলবায়ু বিপর্যয় রোধে ‘সবুজ করের’ বাস্তবতা

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২২, ০০:৩০

বর্তমান বিশ্বে চলমান নানা ইস্যুর মধ্যে জলবায়ু ইস্যু একটি চরম মাত্রায় মাথা ব্যথার কারণ। আমরা একটা সময় ছেড়ে এসেছি যখন শিল্পায়ন শুরু হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আজকের উন্নত বিশ্ব যে শিল্পায়নের মহোত্সবে মেতেছিল, তারই ফল আজ গোটা বিশ্বের সম্মুখীন। অথচ এই লাভ ভোগ করেছে কয়েকটি দেশ। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে শুরু করে শিল্পায়নের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতির চাকার গতি তখন এতটাই তীব্র ছিল যে, তাদের আর আশপাশে তাকানোর সময় ছিল না। কী ঘটছে, কাদের ক্ষতি আর উপকার করছে, সেসবের প্রতি পূর্ণ অগ্রাহ্য দৃষ্টিপাতে বিশ্ব আজ ক্রান্তিকালে এসে ঠেকেছে! সারা বিশ্বে এখন বছরে ৫ হাজার ১০০ কোটি টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ হচ্ছে। এই পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোও এখন উন্নত বিশ্বে নিজের অবস্থান মজবুত করার জন্য মহাসমাবেশে নেমেছে। যার জন্য প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক শিল্পায়ন।

‘দি অ্যানাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিকস’ বইয়ে তাই লেখক বলেছেন, ‘ধনী রাষ্ট্রগুলো এখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিল্পায়নবিরোধী। তাই তারা নির্ধারণ করছে জলবায়ু সম্পর্কিত নানা বিধিনিষেধ।’ আর নীতিনির্ধারকরাই নিজের গড়া নীতি রক্ষা করতে পারছেন না। কপ-২১ তথা ২১তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে (২০১৫ সালে)  বিশ্বের ১৯৫টি দেশ ‘প্যারিস চুক্তি’ নামক একটি খসড়া চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল—‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাস করা।’ কিন্তু এখনো এর বাস্তবায়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি উন্নত বিশ্বে। অজুহাতস্বরূপ তারা বলছেন, দিন দিন তাপমাত্রা আটকে রাখার বিষয়টি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আদৌ কি তারা নাগাল পাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন? 

বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসারণের মাত্র  শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ দায়ী বাংলাদেশ। এরপরও উঠতি দেশ হিসেবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনকে বেশ গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৪ সালে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারকারী ও অতিরিক্ত কার্বন নিঃসারণকারী কারখানা ও ট্যানারিগুলোকে ১ শতাংশ হারে ‘সবুজ কর’ আরোপ করেছে সরকার। অধিক কার্বন নিঃসারণকারী কয়লানির্ভর প্রায় ১৪টি বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে ইতিমধ্যে। যেহেতু আগে থেকেই বিদ্যুতের বৃহদাংশ উৎপন্ন হতো গ্যাস হতে, এবং  প্রাকৃতিক গ্যাস দিন দিন ফুরিয়ে আসছে, তাই এর বিকল্পরূপ দেশে বেড়েছে, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ।  কারখানাগুলোতে ‘সবুজ কর’ আরোপের ফলে দেশে উদ্ধৃত সমস্যা দেখা দিয়েছে; যেমন—পণ্যের গুণমান হ্রাস ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি। 

এভাবে এসব দেশকে উচ্চ খেসারত দিতে হলে তা স্পষ্টভাবে ভুক্তভোগী দেশগুলোর ওপরে উন্নত দেশগুলোর এক ধরনের নির্বিচার ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলত দ্বীপ ও বদ্বীপ রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। এরই লক্ষ্যে, সম্প্রতি মালদ্বীপ সরকার অন্য দেশে জমি কেনার পরিকল্পনাও শুরু করছে। জাতিসংঘের জলবায়ুর পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) ২০০৭ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী ১০-১৫ শতাংশ ভূমি পানির গভীরে তলিয়ে যাবে। অনুমান করা হয়, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। এই ক্ষতিপূরণ কোনোভাবে অর্থ দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। তবু কপ-২৬ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকার চার দফা দাবি পেশ করেছে, এর মধ্যে একটি হলো, ‘উন্নত দেশগুলোতে অভিযোজন এবং প্রশমনে অর্ধেক অর্ধেক (৫০/৫০) ভিত্তিতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এই দাবির কার্যকারিতায় কোনো সংবাদ এখন অবধি পাওয়া যায়নি। 

অতীব ঝুঁকিপূর্ণ এসব রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণের জন্যই ফ্রান্সে ২০০৮ সালে চালু করা হয় ‘সবুজ কর’ ব্যবস্থা। পরিবেশ বিপর্যয় ও পরিবেশের ওপর বেপরোয়া রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের বিষদাঁত বসানো কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতেই বিশ্বব্যাপী আরোপিত একটি আবগারি শুল্ক হলো ‘সবুজ কর’। সারা বিশ্বে কার্বনমুক্ত অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ‘অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমণকারী দেশগুলোকে এই কর বহন করতে হবে এবং প্রতি টন কার্বন নিঃসারণে ৭৫ মার্কিন ডলার মূল্যের কর একটি প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।’ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সুইডেনসহ বেশকিছু উন্নত দেশ এই কর অর্পণ শুরু করেছে। কিন্তু কর আরোপই সকল সমস্যার সমাধান নয়। নামমাত্র কর আরোপে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো নানান অসদুপায় অবলম্বন করে সেই করের অর্থোত্তোলনের চেষ্টা করছে। অতএব, ক্ষমতা কিংবা অর্থনীতি নয়, মানবিকতা বা বিশ্বভ্রাতৃত্বের কথা চিন্তা করে হলেও এই নীরব বিপর্যয়টিকে ঠেকানো এখন সময়ের দাবি। 

লেখক :শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন