বাংলাদেশের মানচিত্রে স্বাভাবিক দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে চোখে পড়বে দেশের সর্ব দক্ষিণ জুড়ে দীর্ঘ সমুদ্রবেষ্টিত অঞ্চল। অঙ্কের হিসাবে যার দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী রায়মঙ্গল-কালিন্দী নদীসহ খুলনা, বরিশাল এবং চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৯টি জেলা নিয়ে এদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী বসবাস করে। একদিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এবং অন্যদিকে ইলিশ, চিংড়ির মতো জনপ্রিয় মাছ রপ্তানিসহ তেল, গ্যাস, লবণ, গন্ধক, শুঁটকি, ধান, পাট, সুপারি উত্পাদনের মাধ্যমে দেশের মোট জিডিপিতে ২৫ শতাংশের বেশি অবদান রেখে চলেছে উপকূলীয় অঞ্চল। তবে উপকূল নিয়ে আমাদের আগ্রহ, আকর্ষণ শুধু অর্থনীতির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে বছরের পর বছর। হিসাব শেষে আমরা ভুলে গেছি দেশের এই এক-দশমাংশ এলাকাকে। ফলে প্রতি বছর নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুললেও পায়নি স্থায়ী কোনো সমাধান।
সম্প্রতি দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে আছড়ে পড়া ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। এর প্রভাবে দেশের ৪১৯টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। সরকারি হিসেবে সিত্রাং-পরবর্তী জলোচ্ছ্বাসে ৬ হাজার হেক্টর ফসলি জমি এবং ১ হাজার মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে আম্ফান, ২০১৯ এ বুলবুল, ২০১৬ সালের রোয়ানু, ২০১৫ সালের কোমেন, ২০১৩ সালের মহাসেন, ২০০৯ সালে আইলা, ২০০৭ সালে সিডরসহ ১৯৯১ এবং ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়সহ বহু ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর শরীর ও মনে ভয়ংকর দাগ রেখে গেছে। অকালে ঝরেছে বহু প্রাণ, ভেসে গেছে বাসগৃহ, জনপদ, ফসলের খেত এবং বিঘার পর বিঘা মাছ ও চিংড়ির ঘের। ফলে শারীরিক এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে বহু গুণ। যার রেশ এখনো বৃহত্সংখ্যক পরিবার কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে আবার নতুন নতুন দুর্যোগের সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের প্রভাব দিনদিন বাড়ছে। জাতিসংঘের ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ ৫ কোটি মানুষ গৃহহীন হতে পারে। সাংঘাতিক চিন্তার বিষয়!
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে বন্যা এবং জলোচ্ছ্বাসই উপকূলবাসীর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির জন্য দায়ী। টেকসই বাঁধের অভাবে জোয়ারের পানি সামান্য বৃদ্ধি পেলেই সমগ্র অঞ্চল প্লাবিত হয়ে পুকুর ও জলাশয়ে ঢুকে পড়ে লবণাক্ত পানি। ফলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে লবণাক্ত পানি পান করে ভুগতে হয় পেটের পীড়া, এলার্জিসহ নানা রোগে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে চড়া সুদে ঋণ করে নিতে হয় চিকিত্সাসেবা, ফলে অর্থনৈতিক সংকট কাটানো হয়ে ওঠে দুরূহ। লবণাক্ত পানিতে জরায়ু সমস্যায় ভোগেন অধিকাংশ নারী। তাছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব পড়ে। যার ফলে অভাব বাড়ে, বাড়ে অপুষ্টি। কৃষক পরিবারে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে পরিবারগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ে। ফলে ভয়ংকর শৈশব নিয়ে বেড়ে উঠতে বাধ্য হয় উপকূলীয় শিশুরা। যা দেশের টেকসই অভীষ্ট উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় ধরনের বাধা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, দুর্যোগকাল ব্যতীত আমরা গুরুত্বপূর্ণ এই জোনগুলো নিয়ে খুব একটা ভাবি না!
ইউএনডিপির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৮০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশে উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৬ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের আরেক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়, যা জিডিপির ২ দশমিক ২ শতাংশ।
আশার কথা হলো—দুর্যোগ প্রশমন এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সমাদৃত; কিন্তু তা সত্ত্বেও বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনা প্রাকৃতিক দুর্যোগের করাল গ্রাস থেকে এখনো মুক্তি মেলেনি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর। দেশের অর্থনীতিতে উপকূলের অবদানকে যেহেতু এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই; তাই দেশের এই প্রান্তিক, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমানের পরিবর্তনে শুধু দুর্যোগকালেই নয়, সারা বছরই সচেতন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
