শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হরিদাসের প্রমোদকুঞ্জ, বেরিয়ে আসছে প্রভাবশালীদের থলের বিড়াল  

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২২, ২১:২৫

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের ছাইতানতলা গ্রামে হঠাৎ করেই একটি বিলাসবহুল প্রমোদকুঞ্জ বানিয়ে আলোচনায় আসেন হরিদাস ওরফে তৌহিদ। প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এমপির এপিএস পরিচয় দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেন হরিদাস। 

সোমবার (৭ নভেম্বর) র‌্যাবের হাতে আটকের খবরে এলাকায় মুখ খুলতে শুরু করেন প্রতারিত মানুষরা।

বগুড়ার হরিদাস ময়মনসিংহের বিয়ে করে হয়ে যান তৌহিদ। হরিদাসের বিলাসবহুল প্রমোদকুঞ্জে আসা যাওয়া করতেন সমাজের বিত্তবানরা। 
 
২০১৯ সালে ছাইতানতলার সবজি বিক্রেতা রফিকুল ইসলামের মেয়ে স্মৃতি আকতারকে বিয়ে করে হরিদাস হয়ে যান তৌহিদ। প্রথমেই এলাকার অসহায় মানুষকে সহায়তা করে তিনি সমাজের পভাবশালী একটি মহলকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করে প্রতারণা। প্রতারক চ্ক্রটি সরকারি ঘর, নলকূপ দেওয়ার নামে শত শত মানুষের নিকট থেকে টাকা নেন। 

২০১৯ সালে ১৩ শতাংশ জমি কিনে সরকারি ১৫ শতাংশ খাস জমি ও খাল দখল করে ৪ কোটি টাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রথমে চিকিৎসালয় করার কথা বলেন হরিদাস। ৪তলা ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলে সুইমিংপুল বানিয়ে কটেজ ব্যবসা শুরু করেন। তার বিলাস বহুল বাড়িতে দিনরাত দেহ ও মাদক ব্যবসা চলতো। 

স্থানীয়রা অতিষ্ঠ হয়ে প্রশাসনের অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো প্রতিকার পেতো না। উল্টো আরও মামলা মোকদ্দসার ভয় দেখি শায়েস্তা করার হুমকি দিতো। ফুলবাড়ীয়া থানার এস আই জালাল উদ্দিন তার দেহরক্ষী হিসাবে প্রায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। 

কয়েকশ মানুষের কাছ থেকে প্রতারণা করে দরিদ্র শ্বশুরবাড়ী অবস্থার পরিবর্তন ঘটান রাতারাতি। কেনেন কোটি টাকার সম্পত্তি। তিন মাস ধরে পাওনাদাররা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করলে তিনি এলাকা ছেড়ে দেন।
 
এলাকাবাসী বহুবার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয়নি। 

আব্দুল মান্নান নামের একজন জানান, হরিদাস ওরফে তৌহিদ স্থানীয়দের সঙ্গে কুকুরের মতো আচরণ করতো। আমরা এলাকাবাসী তার প্রমোদকুঞ্জে অসামাজিক কাজ বন্ধের জন্য প্রশাসনে আবেদন করলেও কেউ খোঁজ নেয়নি।
 
রফিক উদ্দিন জানান, চাকরি দেওয়ার নাম করে আমার কাছ থেকে হরিদাস ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। 

ভাপা পিঠা বিক্রেতা আনোয়ারা জানান, আমার কাছ থেকে ২ বছর আগে ৮৫ হাজার টাকা ধার নেন হরিদাস। সে টাকাও এখন আর দিচ্ছে না।
 
সরেজমিনে হরিদাসের প্রমোদকুঞ্জে গিয়ে দেখা গেছে, সরকারি খাস জমির সঙ্গে ১৩ শতাংশ জমি কিনে ৩৫ শতাংশ খাস জমি দখল করে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ করেছে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নওড়াবাইদের খাল জবরদখল করেছে। 

স্থানীয় বালিয়ান ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ইউনিয়ন ভূমি কর্মর্কতা আনোয়ার হোসেন জানান, সরকারি খাস জমি ও খাল দখলের সত্যতা পাওয়ার পরও এখনো রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়নি বলে স্বীকার করেন। 

ছাইতানতলা গ্রামে গিয়ে কথা হয় হরিদাস ওরফে তৌহিদের দাদা শ্বশুর আইয়ুব আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, আমরা গরীব মানুষ তাকে বার বার বারণ করার পরও সে তাদের কথা শুনে নাই। হরিদাস ওরফে তৌহিদ বেপরোয়া জীবন যাপন করতো। গরু খাসি জবাই করে তার বাড়ীতে আনন্দফুর্তি করতো। অনেক প্রভাবশালীরা তার আড্ডায় অংশ নিতো। প্রশাসনরে লোকজনও থাকতো তার আড্ডায় বলে জানান তিনি।
 
হরিদাস ওরফে তৌহিদের স্ত্রী স্মৃতি আকতার জানান, পরিবারের লোকজন কম বয়সে তার সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিয়েছে। আমি প্রতিবাদ করলে সে গালমন্দ করতো। তবে সংসার আগেও চেয়ে এখন ভালো চলে বলে জানান তার স্ত্রী।
 
চাকরি ও তদবির করার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতকারী হরিদাস ওরফে তৌহিদের প্রমোদকুঞ্জে  এলাকাবাসী দুই মাস আগে ঋনের দায়ের কটেজ বন্ধ লেখে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়ে ছিলেন।
      
স্থানীয় বালিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান পলাশ জানান, হরিদাস ওরফে তৌহিদ একজন প্রতারক। তার প্রতারণার কৌশলে শত শত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। আমার কাছে বহু মানুষ টাকা উদ্ধারের জন্য এসেছে। এর মধ্যে এক ওসির আত্মীয়ও আছেন। তবে তার শাস্তি হওয়া দরকার। 

বালিয়ান বিট পুলিশের দায়িত্বে থাকা এস আই জালাল উদ্দিন জানান, আমার কাছে তার কটেজে অসামাজিক কাজকর্ম চলে মর্মে এলাকাবাসীর একটা অভিযোগ ছিলো। কিন্ত আমরা তার সত্যতা পাইনি। তিনি সময় পেলেই ঐ কটেজে গিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেন নাই। 

ফুলবাড়ীয়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, আমি নতুন এসেছি। আমি তাকে চিনি না। 

ইত্তেফাক/পিও