অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে প্রথম শিল্পবিপ্লব শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েক বার শিল্পবিপ্লব ঘটেছে। এর ফলে পুরো বিশ্বে প্রসার ঘটছে শিল্পের। শিল্প প্রসারের এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে শিল্প-কারখানা। দক্ষ জনশক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন শিল্পের আবিষ্কার করছে বাংলাদেশ। যদিও এসব শিল্পকারখানার বদৌলতে দেশের উন্নতি হলেও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বেশি। কারণ এসব শিল্পকারখানা থেকে প্রতি দিন হাজার হাজার টন বর্জ্য-পানি তৈরি হচ্ছে, যা নদীনালা, খালবিল, পুকুর ও কৃষি জমিতে মিশে বিষাক্ত করে তুলছে খাবার পানি।
পানি আমাদের জীবন। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই পানি হওয়া সত্ত্বেও বিশুদ্ধ খাবার পানির পরিমাণ খুবই কম। গবেষণায় জানা গেছে, পানিদূষণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির বেশ বড়সড় একটা সংকট দেখা দেবে। পরিবেশ অধিদপ্তর আইন বলছে, কলকারখানার কেমিক্যালযুক্ত এই বর্জ্য-পানি পরিশোধন করতে হবে এবং সেই পানি আবার কাজে লাগাতে হবে। এজন্য ব্যবহার করতে হবে তরল বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি প্ল্যান্ট— অ্যাফ্লুয়েন্ট।
উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ইটিপিতে ব্যবহার করা হয় চুন, ফটো ইলেকট্রোলাইট, ফিটকারি, পাথর, কার্বন ফিল্টার, লাল গুঁড়া পাথরসহ পরিবেশবান্ধব কেমিক্যাল। পরিবেশবান্ধব হলেও এসব কেমিক্যালের দাম অনেক বেশি এবং ইকুইপমেন্টগুলোর প্রায় সবই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণে ইটিপি প্ল্যান্টের খরচ বেশ ব্যয়বহুল। আর খরচ বেশি হওয়ার কারণেই অধিকাংশ কারখানায় ইটিপি প্ল্যান্ট থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার করছে না কারখানা মালিকেরা। এক জরিপে দেখা গেছে, একটা সাধারণ ইটিপি প্ল্যান্ট স্থাপনে ব্যয় হয় ৭০-৮০ লাখ টাকা, যেখানে একটি অত্যাধুনিক বায়োলজিক্যাল ইটিপি স্থাপনে দুই-তিন কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়ে যায়। ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে ইটিপি প্ল্যান্ট ব্যবস্থা এবং দিন দিন পানি দূষণের মাধ্যমে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিনিয়তই জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগের খবর পাওয়া যায়। খরচ বাচাতে গিয়ে যাতে মানুষের কিংবা প্রাণীর জীবন বিপদমুখী না হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশের এক এনজিও—আগ্রহ। জার্মানির এক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় কাজ করছে এই এনজিওটি। তারা দেশে সৌরবিদ্যুৎ চালিত এক বিশেষ ধরনের পরিশোধন যন্ত্র আবিষ্কার করেছে, যা গার্মেমেন্টস এবং টেক্সটাইল শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পের বর্জ্য-পানি পরিশোধন করবে। একই সঙ্গে সেই পরিশোধিত পানি হবে বিশুদ্ধ এবং পানযোগ্য।
যেহেতু এই ইটিপি প্ল্যান্ট সৌর বিদ্যুৎচালিত, তাই এখানে আলাদা করে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে না। এর ফলে প্রচলিত ইটিপি প্ল্যান্টের তুলনায় এর পরিচালন খরচ অনেকাংশে কম পড়বে। এটি সহজেই স্থাপন করা সম্ভব এবং পানি পরিশোধনে সময়ও কম লাগবে। পরিচালন ব্যবস্থাও প্রচলিত ইটিপি প্ল্যান্টের তুলনায় খুবই সহজ সরল। এই ইটিপি প্ল্যান্টের সবচেয়ে উপকারী দিক হচ্ছে, শোধনের পরে যে-ই স্লাজ থাকে, সে-ই স্লাজের পরিমাণ খুবই কম হয় এবং খুব সহজেই পরিবেশে মিশে যায়। এতে করে পরিবেশ দূষণও হবে না। তাই এখন উচিত, এই নতুন প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে পানিদূষণ রোধ করা। আর এতে করে শুধু পানিদূষণ রোধ হবে না, উপরন্তু দূষিত পানি পরিশোধিত হয়ে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হবে। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য হ্রাসের লক্ষ্যে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী সব শিল্প প্রতিষ্ঠানে যে জিরো ডিসচার্জ পলিসি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সর্বোপরি আমরা পাব দূষণমুক্ত গন্ধহীন বিশুদ্ধ পানি।
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
