বর্তমানে যেখানে মহামারির ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ বিনিময় হার, রিজার্ভের স্বল্পতা ইত্যাদি নিয়ে যখন প্রায় সব দেশ অস্থির, তখন বেকারত্ব যেন আগুন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির ভাষায়, বেকার বলা হয় সেই সব ব্যক্তিকে, যারা শ্রমবাজারে অংশ নিয়েছেন; কিন্তু এখনো কাজ খুঁজে পাননি। অত্যধিক চেষ্টা করছেন চাকরির প্রত্যাশায়।
সাধারণত একটা দেশে তিন ধরনের বেকারত্ব দেখা যায়, ফ্রিকশনাল আনএমপ্লয়মেন্ট, যা সংঘটিত হয় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে; যে সময়টুকু মানুষ কাজ করে না বা যারা সবে অনার্স বা মাস্টার্স পাশ করেছেন এবং কাজের সন্ধানে আছেন। ফ্রিকশনাল আনএমপ্লয়মেন্ট সব দেশেই অনিবার্যভাবে থাকবে। অন্যদিকে স্ট্রাকচারাল আনএমপ্লয়মেন্ট, যেটা সংঘটিত হয় ব্যক্তি আর কর্মসংস্থানের মধ্যে দক্ষতার অমিলের কারণে। এদিকে যখন দেশের সামষ্টিক চাহিদা কমে যায় এবং এর ফলে যে বেকারত্বের সৃষ্টি হয়, তা-ই সিক্লিক্যাল আনএমপ্লয়মেন্ট, যা একটা দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এবং সব দেশের সরকার এই বেকারত্বকেই নিয়ন্ত্রণ করতে তৎপর হয়ে ওঠে; কেননা, এই বেকারত্বের পার্শ্বরোগ অনেকের জন্য যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। পার্শ্বরোগগুলো হলো মাদক, সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, সামাজিক বিকৃতি, ধর্ষণ, খুন, আত্মহত্যা, চাঁদাবাজি, বালু চুরি, পর্নোগ্রাফি, স্থানীয় মস্তানি ইত্যাদি।
অর্থনীতিতে বেকারত্বের তিনটি থিওরি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। একটি হলো ‘ওয়েজ থিওরি’, যেখানে মালিক স্বেচ্ছায় কর্মীকে উচ্চ বেতন দেন, যাতে করে কর্মীর উত্পাদনশীলতা বাড়ে আর মালিক অধিক লাভবান হন, ফলে শ্রমবাজারে শ্রমের চাহিদা আর জোগানে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ‘ইনসাইডার-আউটসাইডার থিওরি’, যেখানে চাকরির ক্ষেত্রে যারা কর্মে লিপ্ত আছেন, তাদের একটা দরকষাকষির শক্তি থাকে। যেহেতু তারা অনেক দিন ধরে কাজ করে আসছেন, তাদের কর্মস্থলে এবং তারা অনেক গোপন বিষয় জানেন বিধায় তারা মালিকের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে উচ্চ মজুরি আদায় করে নিলে দেখা যায় অনেকে, যারা ঐ কর্মস্থলে ঢুকতে পারতন, তারা বেকার থেকে যান। ফলে শ্রমবাজারে অসামঞ্জস্য থেকে যায়। এদিকে উন্নত অনেক দেশে বেকার ভাতা দেওয়া হয় আর এই বেকার ভাতা যদি একজন বেকার ব্যক্তির কর্মক্ষেত্রে কাজের ফলে প্রাপ্ত মজুরির চেয়ে বেশি হয়, তখন ঐ ব্যক্তি বেকারই থেকে যান এবং এটা হলো ‘ইমপ্লিসিট কনট্রাক থিওরি’ যা বেকারত্ব সৃষ্টির জন্য দায়ী।
বেকারত্বের হারে দেখা যায়, ২০২০ সালে করোনাকালে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বর্তমানে ২০২২ সালে বেকারত্বের হার বলা হচ্ছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। মিলটন ফ্রিডম্যান বেকারত্বের একটা ন্যূনতম হার ঠিক করেছেন, যা মহা-উন্নতিতেও অক্ষয় থাকে—এই হার ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ এই হার অর্জন করেছে জানলে ফ্রিডম্যান হয়তো বিস্মিত হতেন অথবা দেশের জনগণের মতো সন্দেহ করতেন। আবার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের জন্য শ্রমবাজার আরো কঠিন হয়ে উঠেছে বা উঠছে। ২০২২ সালের শেষে এই বয়সি তরুণ বেকারের সংখ্যা ৭ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। যদিও ২০২১ সালের চেয়ে তা কিছুটা কম—৭ কোটি ৫০ লাখ।
আসলে বাংলাদেশে বেকারত্ব কতটা প্রকট তা গ্রামেগঞ্জে না হাঁটলে কেবল রাজধানীতে বসে পরামর্শক সেজে অনুধাবন করা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। মফস্সল ও গ্রামগঞ্জে বেকারত্বের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। এদিক-সেদিক বসে থাকেন। তরুণেরা দলে দলে কাঁড়ি কাঁড়ি ডিগ্রি অর্জন করছেন বটে; কিন্তু তাদের প্রত্যাশানুযায়ী মিলছে না কর্মসংস্থান।
১৯৮১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৩০ শতাংশ। ২০১১ সালে সেটি ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটি একটি বিপ্লব। তবে তা মানহীন বিপ্লব। সেজন্য আবার পেছনে তাকাতে হচ্ছে। ভুল ছিল তারকাখচিত অজস্র ফলাফল। পাশের হার গগনচুম্বী। এত উচ্ছ্বাস! এত আনন্দ! কিন্তু এর পরিণামও করুণ। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও দুবেলা ভাতের বিনিময়ে গৃহশিক্ষকতার প্রার্থনা! এগুলো আরো ঘটবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সঠিক অঙ্কের দিকে নজর দিতে ব্যর্থ হব। এদিকে বাংলাদেশের মতো আরো অনেক দেশে আইএলও পদ্ধতিতে বেকারত্ব গণনা করা হয়, যেখানে গত এক মাসে যিনি দু-এক ঘণ্টার জন্য কর্মে ছিলেন, তিনিও কর্মী, বেকার নন। যে ফর্মুলায় চললে বাংলাদেশ কেন, সারা পৃথিবীতে একমাত্র দণ্ডায়মান ভাস্কর্য ছাড়া আর কোনো বেকার খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই পদ্ধতি দ্রুত পরিত্যাগ করে আমাদের দেশের উপযোগী জরিপ সাজাতে হবে। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি আরো দু-একটি স্বাধীন সংস্থা এই দায়িত্ব পেতে পারে।
সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও প্রকৃত বেকারত্ব যে কয়েক গুণ বেশি—এ কথা বিআইডিএসের গবেষণাতেই উঠে এসেছে। ১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির অর্থনীতি উপদেষ্টা আর্থার আকুন এক তত্ত্ব দেন, যা পরে অর্থশাস্ত্রে ‘আকুনস ল’ বলে ঠাঁই পায়। এটি দেখায় যে, প্রবৃদ্ধি বাড়লে বেকারত্ব কমে। কারণ, প্রবৃদ্ধি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। কিন্তু বেকারত্বের ভুল মাপের কারণে ‘আকুনস ল’ বাংলাদেশে উলটো হয়ে দেখা যাচ্ছে। তাই এখন সময় বেকারেরসংখ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করার। পাশাপাশি অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো পেশাগুলোকে সম্মানের চোখে দেখা, আত্মকর্মসংস্থান আর সম-উপযোগী দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলার দিকেও নজর দিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, বেকার সমস্যার সমাধান করা না গেলে দেশ উন্নতির চরম শেখরে পৌঁছাতে পারবে না কোনোভাবেই।
লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
