বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ওহ্! মুখ থুবড়ে পড়েছেন ট্রাম্প

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০৭:০৩

ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে আবারও বসতে চান! নতুন করে রাজনীতির ময়দানে নামতে চান এই সাবেক প্রেসিডেন্ট! পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন ধুঁকতে থাকা ট্রাম্প। ঝিমিয়ে পড়া ট্রাম্পের নির্বাচনে নামার ঘোষণা এ বছরের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক খবর বৈকি! তার বক্তব্য অনুমানের বাইরে কিছু নয়। আমরা সীমান্তে দখলের কথা শুনেছি, হোয়াইট হাউজে র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটদের কথা শুনেছি। এর সবই ছিল এক সুতায় বাঁধা—নিজের প্রশংসা এবং প্রয়োজনে নিজের তৈরি মিথ্যা। বস্তুত, সাবেক এই প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এর বিপরীত কিছু প্রত্যাশা করা বাতুলতা।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ট্রাম্প তার বাসভবন মার-এ-লাগোতে যখন প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে অবতীর্ণ হওয়ার ঘোষণা দেন, তখন সেখানে বিশিষ্ট রিপাবলিকানদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। আমন্ত্রিত রিপাবলিকানদের আসনগুলো তো খালি ছিলই, মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর অনুপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। এমনকি উপস্থিত মিডিয়াগুলোর মধ্যেও ছিল না আগ্রহের বালাই!

উল্লেখ করার মতো বিষয়, ট্রাম্পের নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা রিপাবলিকান দলের অন্যান্য মনোয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। রিপাবলিকান পার্টির নমিনেশন দৌড়ে থাকা প্রতিযোগীদের কেউই এতে বিচলিত নন। যেমন—ট্রাম্পের প্রশাসনে কাজ করা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অনেক দিন থেকেই বলে আসছেন, ট্রাম্পের প্রার্থী হওয়া-না হওয়া তার জন্য কোনো বাধা নয়। অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পেতে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণার পরও আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন পম্পেও—তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না। উপরন্তু, সাবেক বসকে উদ্দেশ্য করে তিনি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন, ‘আমাদের এমন সব নেতার প্রয়োজন, যারা কেবল সামনের দিকেই হাঁটতে পছন্দ করেন, ছোটখাটো শিকারের লোভে পেছনে তাকান না।’ পম্পেওর মতো একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন অন্যান্য বিশিষ্ট রিপাবলিকান নেতাও।

এখন প্রশ্ন হলো, রিপাবলিকানরা এতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া কেন দেখাচ্ছেন? মোটা দাগে এর প্রধান কারণ হচ্ছে সদ্যসমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের আশানুরূপ ফল না পাওয়া, যার জন্য মূলত ট্রাম্পই দায়ী। প্রায় সবার সাফ কথা, ট্রাম্পের কারণেই ভরাডুবি হয়েছে তাদের! রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের মতোই ‘পোস্ট-ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টি’ গঠনের কথা বলছে ডানপন্থি মিডিয়াগুলো। এর অর্থ, ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে রিপাবলিকান পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের দাবির বিষয়টি এখন অনেকটাই প্রকাশ্য।

এই যখন অবস্থা, তখন আলাপ-আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে রন দিসান্তিসকে কেন্দ্র করে। এই মুহূর্তে ফ্লোরিডার এই গভর্নরের দিকেই পাল্লা ঝুঁকে রয়েছে। গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টিকে ‘স্বাভাবিক’ চেহারায় ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে দিসান্তিসই রিপাবরিকানদের পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ট্রাম্প জমানা কিংবা ট্রাম্প-পরবর্তী সময়কালে রিপাবলিকান দলের যে অস্বাভাবিক চেহারা ফুটে উঠেছে, তার উত্তরণে দিসান্তিসকে ভরসা মানছেন বেশির ভাগ রিপাবলিকান নেতা-সমর্থক। এই তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদ ও ভোটার উভয়ই। দিসান্তিসকে নিয়ে ইতিমধ্যে মন্তব্য করেছেন আইডাহোর রিপাবলিকান রিপ্রেজেন্টেটিভ মাইক সিম্পসন। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, দিসান্তিসের নীতিগুলো বেশ ভালো। তাই এ নিয়ে আর কোনো নাটকের দরকার নেই।’ সত্যিকার অর্থে, সিম্পসনের এ কথার সঙ্গে রিপাবলিকানরা পুরোপুরি একমত।

অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রাথমিক বাছাইপর্বে ট্রাম্পকে হারাতে কতটা বেগ পেতে হবে, নাকি মাঠের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হবেন ট্রাম্প? এটা সত্য যে, ট্রাম্পের ‘সাবেক প্রেসিডেন্ট’ তারকাখ্যাতি ইতিমধ্যে বিবর্ণ হয়ে গেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই রিপাবলিকানদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তা হারান। জনপ্রিয়তা ক্ষয় পেতে পেতে তা এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকে যে, তার প্রতি রিপাবলিকান ভোটারদের সমর্থন নেমে যায় ৫০ শতাংশের নিচে। মিডটার্ম ইলেকশনের আগে পরিচালিত জরিপ মতে, ২০২৪ সালের প্রেসেডন্ট নির্বাচনে প্রাথমিক বাছাইপর্বে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন রয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ রিপাবলিকানের। বিপরীতে, দিসান্তিসের তারকাখ্যাতি তুঙ্গে! দিসান্তিসের প্রতি জনসমর্থন মিডটার্মের আগে ট্রাম্পের তুলনায় অর্ধেক থাকলেও এখন তা অনেক ওপরে উঠে গেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, ট্রাম্পবিরোধী বিভিন্ন রক্ষণশীল গোষ্ঠী নতুন নতুন জরিপ তুলে ধরছে মিডিয়ায়, যাতে দেখা যাচ্ছে, দিসান্তিস ইতিমধ্যে ট্রাম্পকে পেছনে ফেলে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছেন।

ফ্লোরিডার গভর্নর হিসেবে দিসান্তিস বেশ সফল। তার রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিও স্বয়ং তিনি। তাছাড়া তার প্রতি জনসমর্থন বাড়ছেই। সত্যি বলতে, স্থানীয় নির্বাচনে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তাকে ট্রাম্পের মতো বাঘা প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হয়নি যদিও, কিন্তু ২০২৪ সালের রিপাবলিকান মনোনয়নের ভোটাভুটিতে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তো এই হিসাবনিকাশ পালটে যাবে! মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাঠে ট্রাম্পের সঙ্গে দিসান্তিসের দেখা না হলেও সম্ভবত ২০২৪ সালের ভোটে দেখা হবে। সুতরাং, কোটি টাকার প্রশ্ন—তিনি কি সব জেনেশুনেও ট্রাম্পকে ছাড় দেবেন, নাকি লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন? এর উত্তর অবশ্য ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে—নড়েচড়ে বসছেন দিসান্তিস। চলছে পালটাপালটি আক্রমণ, যদিও তা এখন পর্যন্ত মৃদুই।

কোনো সন্দেহ নেই, রিপাবলিকান পার্টির মূল সমস্যা হলো ‘ট্রাম্প’। এটা সবারই জানা, ট্রাম্প তার দলকে খুব একটা পরোয়া করেন না। এমনকি আবারও প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর ঘোষণা অনেকটা তার একার সিদ্ধান্ত। ভুলে গেলে চলবে না, জেলের বাইরে থাকতে ট্রাম্পকে কিন্তু লম্বা দৌড় দৌড়াতে হবে। সে জন্য তিনি তড়িঘড়ি করে ঘোষণা দিয়েছেন কি না, ভেবে দেখা দরকার বৈকি।

সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বেশ কয়েকটি আইনি মামলার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিভিন্ন বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অপরাধের লম্বা লিস্ট রয়েছে। নথি অব্যবস্থাপনা, হাঙ্গামা-বিদ্রোহ এবং ট্যাক্স জালিয়াতির মতো অপরাধের শাস্তি যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বেশ কড়া। তাছাড়া এসবের জন্য ট্রাম্পকে গুনতে হবে প্রচুর অর্থ। সুতরাং, এসব থেকে বাঁচতে ট্রাম্পের জন্য এখন সব থেকে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে ‘রাজনৈতিক প্রচারণা’। ট্রাম্প কি তাহলে এই কৌশল বেছে নিয়েই তাড়াতাড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে বসলেন!

একজন সাধারণ নাগরিক কিংবা একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প যতটা দুর্বল, ঠিক ততটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবেন, যদি তিনি রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন হাসিল করতে পারেন। এমনটি ঘটলে রিপাবলিকান পার্টি ক্ষমতায় না এলেও বেশ লাভবান হবেন ট্রাম্প। কেননা, বিভিন্ন বিষয় থেকে তিনি সাময়িক সময়ের জন্য হলেও রেহাই পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ, রিপাবলিকান পার্টির সামনের দিনগুলোর হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল হয়ে উঠছে।

এমতাবস্থায়, রিপাবলিকান পার্টির সামনে একটাই রাস্তা খোলা—ট্রাম্পকে ‘পরাজিত’ সৈনিকে পরিণত করা। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে তিনি কী কাণ্ড করেছিলেন, তা কারো অজানা নয়। তাই তাকে আবারও সেই অবস্থায় নিয়ে দাঁড় করাতে হবে, যা তিনি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেন—অবমূল্যায়ন! বহু রিপাবলিকান এখনো ট্রাম্পকে সমর্থন করেন—এ কথা যেমন সত্য, তেমনিভাবে এ কথাও সত্য—দিনদিন তার প্রতি রিপাবলিকান ও সাধারণ ভোটারদের আস্থা ব্যাপকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাকে পাড়ি দিতে হবে লম্বা পথ, মোকাবিলা করতে হবে বহু প্রতিকূলতা। সমস্যা সামলাতে হবে ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই। অর্থাৎ, ট্রাম্প মুখ থুবড়ে পড়েছেন বা পড়তে চলেছেন—এ কথা বলাই যায়।

লেখক : মার্কিন কলামিস্ট এবং জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির পাবলিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রফেসর

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন