ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আমেরিকার আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

২০২৪ সাল বিশ্বের জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। এ বছরের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্টে অনুষ্ঠিত হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশটির গণতন্ত্রকে বড় ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনি লড়াইটা হবে দুই দলের প্রতীক হাতি ও গাধার মধ্যে। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে নানা জল্পনাকল্পনা, হিসাব-নিকাশ ও ছক কষাকষি।

নির্বাচনি জরিপের ফল যদি শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক থাকে, তাহলে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই দল থেকে প্রার্থী হিসেবে দেখা যাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। জো বাইডেন হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সি প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে ট্রাম্প দেশটির ইতিহাসে প্রথম কোনো সাবেক প্রেসিডেন্ট, যাকে নানা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

আসছে নির্বাচনে প্রার্থী হতে জোর চেষ্টা ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভোটযুদ্ধ থেকে কোনোভাবে যেন ছিটকে না পড়েন, সে বিষয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপও করছেন তিনি। আদালতে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার প্রার্থিতা আটকে যাবে, প্রচারপ্রচারণা থমকে যাবে স্বাভাবিকভাবেই। দেওয়ানি জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে হারাতে পারেন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও। এসব বিষয় ট্রাম্প যেহেতু খুব ভালোমতোই জানেন, তাই আইনি পদক্ষেপের প্রশ্নে তিনি বসে আছেন এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে এসব ঘটনা যে মার্কিন রাজনীতিতে ‘ঝামেলার স্তূপ’ জড়ো করছে, তা বলাই বাহুল্য।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ক্রমশ জট পাকিয়ে যাচ্ছে। একটি একটি করে আইনি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ট্রাম্পের আইনজীবীরা অবশ্য তাকে ভোটের মাঠে রাখতে কোনো খামতি করছেন না। তবে এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর ‘৩ নম্বর ধারা’। ঐ ধারায় সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ব্যক্তিদের সরকারি পদে নিষিদ্ধ করে গণতন্ত্রকে অধিকতর সুরক্ষিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি সিনেটর বা কংগ্রেসের সদস্য, প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট, কোনো দপ্তরের প্রধান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অথবা অঙ্গরাজ্যের অধীন সামরিক অথবা বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সেই শপথ ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন বা বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকেন বা শত্রুদের কোনো ধরনের সহায়তা দেন, তাহলে তিনি আর ঐ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না।’

আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন, কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের নিম্ন আদালত ও অঙ্গরাজ্যটির সুপ্রিম কোর্ট উভয়েই ট্রাম্পের ‘বিদ্রোহে জড়িত’ থাকার বিষয়ে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন। যদিও শেষ বিচারে ট্রাম্প ভোটে দাঁড়াতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এ দুই আদালতের আইনি বিশ্লেষণে কিছু ক্ষেত্রে ফারাক রয়েছে। আপাতত দুটি রাজ্যে বড় ধরনের আইনি ঝামেলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। রাজ্য দুটি হলো মেইন ও কলোরাডো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিদ্রোহে মদত দেওয়ার দায়ে আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রশ্নে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন তিনি। অন্যান্য রাজ্যে ট্রাম্পকে অবশ্য এ ধরনের ঝক্কিতে পড়তে হচ্ছে না এখন পর্যন্ত। যদিও আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।

মনে থাকার কথা, ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন জয়ী হলে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বসেন তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একপর্যায়ে ট্রাম্পের উসকানিতে তার উগ্র সমর্থকেরা কংগ্রেস ভবনে (ক্যাপিটল হিল) সহিংস হামলা চালায়, যাতে পুলিশসহ নিতহ হন কয়েক জন। ঐ ঘটনার সূত্র ধরে মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ, ২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের জয়ের পর ফল পালটে দিতে হস্তক্ষেপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়া এবং সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে প্রবঞ্চনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। অন্যদিকে ট্রাম্প যুক্তি দেখিয়ে আসছেন, ক্যাপিটল হিলের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে, তা খারিজ করে দেওয়া উচিত। কারণ, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কাজের জন্য সাবেক কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা যায় না।

গত ১ ডিসেম্বর ট্রাম্পের যুক্তি খারিজ হলে এর বিরুদ্ধে আপিল আদালতে আবেদন করেন তিনি। ট্রাম্পের ঐ আবেদনের ফলে তার বিরুদ্ধে করা মামলার বিচারকাজ স্থগিত হয়ে যায়। আগামী মার্চে ঐ বিচারকাজ আবার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে সমর্থকদের দাবি, ট্রাম্পকে ভোট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হলে তা মার্কিন রাজনীতির জন্য অশুভ সংকেত বয়ে আনবে। লাখ লাখ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাদের সাফ বক্তব্য, ক্যাপিটলে হামলা কোনো বিদ্রোহ ছিল না। তাছাড়া একে বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও তাতে ট্রাম্পের কোনো হাত ছিল না। এতে তিনি আদৌ উসকানি দেননি। অভিযোগের খড়্গ থেকে ট্রাম্প নিষ্কৃতি পান বা না পান, একটি বিষয় স্পষ্ট, আর্থিক দিক দিয়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ট্রাম্প। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে স্থায়ী কালি না পড়লেও ব্যবসায়-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবেন নিশ্চিতভাবে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, গ্রহণযোগ্য যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে ট্রাম্প দায়মুক্তি পেলেও একটি ক্ষেত্রে তার জন্য বড় ধরনের সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এই আশঙ্কা অবান্তর নয়, আগামী ৫ নভেম্বর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তার আগে বিচারকাজ শেষ হবে কিনা। এই প্রশ্ন অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, আদালত মামলার শুনানির জন্য দ্রুত অগ্রসর হলে ট্রাম্প নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন। তবে আদালত যদি ধীরগতিতে চলে, তাহলে ভোটের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে বাধ্য হবেন তিনি।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, ট্রাম্পের জন্য বিষয়গুলো এতটা জটিল ও কঠিন হয়ে উঠছে কেন? এ সম্পর্কে জানিয়ে রাখতে হয়, ট্রাম্প হলেন প্রথম কোনো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তা-ও আবার বিদ্রোহের, যা সংবিধান পরিপন্থি। তিনিই প্রথম কোনো সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি এ ধরনের অভিযোগের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। আমেরিকার সংবিধানে বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর যে, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে কী ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, তা নিশ্চিত করে বলতে পারা খুবই কঠিন।

মনে রাখতে হবে, একটি বা দুটি নয়, অন্তত ৩৪টি রাজ্যে প্রার্থিতার বিষয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ট্রাম্প। কাজেই ট্রাম্পের সামনের পথ বেশ বিপত্সংকুলই বলতে হবে। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, নির্বাচন থেকে ট্রাম্প ছিটকে পড়লে তা মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য কী ধরনের ফল বয়ে আনবে।

আগেই বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারলেও ব্যাবসায়িক দিক থেকে বেশ খানিকটা ক্ষতির মুখে পড়বেন ট্রাম্প। হাউজ ডেমোক্র্যাটরা যেসব নথি হাজির করছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ক্ষমতা ব্যবহার করে ২০টি দেশ বা সরকার থেকে সুবিধা আদায় করেছে ট্রাম্পের মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি। এভাবে কমপক্ষে ৭.৮ মিলিয়ন ডলারের সুবিধা ঢুকেছে কোম্পানিগুলোর পকেটে। সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে চীন থেকে—৫.৫ মিলিয়ন ডলার। অভিযোগ আছে, রিপাবলিকান সমর্থন ও আনুকূল্য পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে কিংবা ভয় দেখিয়ে এসব অর্থ ও সুবিধা হস্তগত করা হয়েছে। এ ধরনের বিপজ্জনক অভিযোগ খারাপ সময় ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট বটে! 

শেষ কথা হলো, ’২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প নির্বাচন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে কলোরাডোর সুপ্রিম কোট যে রায় দিয়েছে, তাকে কেউ বলছেন ‘বিস্ফোরক’, কেউ ‘বোমা ফাটানো’, কেউ-বা ‘গণতন্ত্রের একটি মাহেন্দ্রক্ষণ’। যদিও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হয়ে কে প্রার্থী হবেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ৫ মার্চ পর্যন্ত। এদিন কলোরাডোয় অনুষ্ঠেয় প্রাইমারি ইলেকশনে ভোট দেবেন মার্কিন ভোটাররা। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই কৌতূহল বাড়ছে। প্রশ্ন দানা বাঁধছে, রিপাবলিকান পার্টির প্রাইমারিতে দলটির ব্যালটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম থাকছে তো?

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার রাজনৈতিক সংঘাত ও অপরাধ এবং সিনিয়র রাজনৈতিক প্রতিবেদক

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর: সুমৃত খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন