সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় চাই সঠিক পদক্ষেপ

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ০০:৩০

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে বর্তমানে সকল প্রকার দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির ফলে জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মহামারি করোনা সংকট কাটাতে না কাটাতেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বিশ্বঅর্থনীতিতে ফেলেছে বিরূপ প্রভাব। এরই মধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্বখাদ্যকর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের ৪৫টি দেশে তীব্র খাদ্যঘাটতি হতে পারে। এতে খাদ্যসংকটে ভুগতে পারে বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি মানুষ। 

সম্প্রতি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে মন্দা শুরু হলে ৩৫ কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে পড়বে। ৪৮টি দেশের ৪ কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে আছে বলে জানায় সংস্থা দুটি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জরিপে দেখা যায়, এশিয়ার ৯টি দেশ বড় রকমের খাদ্যসংকটের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। 

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—এই তিনটি বিষয় সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা যায় শুধু ইউক্রেন থেকেই বিশ্বের ৪০ কোটি মানুষের খাদ্যচাহিদা মেটানো হতো। কিন্তু যুদ্ধের ফলে ইউক্রেন খাদ্য আমদানি এক রকম বন্ধ করে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ব জুড়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০-৬০ কোটি বাড়তে পারে। 

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টিগ্রেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের (আইপিসি) বিশ্ব হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ এখন মধ্যম ও গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যা মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার ৩ কোটি ৩০ লাখ দরিদ্র এবং এর ভেতরে ১ কোটি ৭০ লাখ অতিদরিদ্র। দ্রব্যের মূল্য বাড়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের কারখানার কাঁচামালসহ সব ধরনের দ্রব্যের দাম বেশি হওয়ার কারণে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলোতে যথেষ্ট পোশাক উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছে। 

বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক বলছে, বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির সংকুচিত মুদ্রার মান, খাদ্য ও জ্বালানি  সংকটকে আরো গভীর করতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে ইতিমধ্যেই মন্দা দেখা দিতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এটি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে বলে বলা হচ্ছে। 

এমতাবস্থায়, আসন্ন দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা একান্ত জরুরি বিষয়। এই ভয়াবহ অবস্থা মোকাবিলায় কৃষি, শিল্প খাতসহ সব খাতের উৎপাদন বাড়াতে হবে। খাদ্যশস্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে কৃষি জমির অকৃষি খাতে ব্যবহার যথাসম্ভব বন্ধ করতে হবে। মনে রাখা দরকার, দেশে মাথাপিছু মোট ক্যালোরির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে চাল থেকে। অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের মানুষ দুই বেলা পেট পুরে খেতে পারলে পুষ্টির সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে। চলমান সংকটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বাগ্রে জোর দিয়েছেন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই স্কিম থেকে কম সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলো দশমিক ৫০ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। আসন্ন মন্দার ঝুঁকি এড়াতে উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। দুর্নীতি ও অপচয় রোধ এবং ডলার পাচার বন্ধ করাও জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো না গেলে সবার আত্মবিশ্বাস কমে যাবে বিধায় সে দিকটিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে রাজস্ব ও ব্যাংক খাত সংস্কার করতে হবে। মোটকথা, আসন্ন দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সময় থাকতেই ভাবতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন