শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়: পাওয়া-না পাওয়ায় ৪২ 

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০০:১১

আজ ২২ নভেম্বর মঙ্গলবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ৪৪ বছরে পদার্পণ করছে। তার সুদীর্ঘ পথচলায় যেমন রয়েছে প্রাপ্তি, তেমন আমাদের রয়েছে প্রত্যাশাও। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অবদান রেখে চলেছেন। শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, শিক্ষা, খেলাধুলা ও গবেষণায় দেশ ও দেশের বাইরে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে অবদান রেখে চলেছে। যার ফলে, সব ধর্মের মানুষের কাছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির মডেল হিসেবে পরিচিত। এযাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট চার বার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে ২ হাজার ১৮৮তম ও জাতীয় র‍্যাংকিংয়ে ২৫তম অবস্থানে রয়েছে, যা কাম্য ছিল না। ল্যাবের অবস্থা ভালো না থাকায় বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। যেখানে বিশ্বায়নের ফলে শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানে পিছিয়ে থেকে সেকালে রয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নতুন বইয়ের সংযুক্তি হচ্ছে না, লাইব্রেরিকে ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগ নিলেও অবজ্ঞায় পড়ে রয়েছে ল্যাবের কম্পিউটারগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীরা পায়নি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল। ফলে ই-লার্নিং, গবেষণাক্ষেত্র ও শিক্ষাবৃত্তিসহ অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটটি নয় উন্নত, নেই প্রয়োজনীয় তথ্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তথ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়-সম্পর্কিত বিশদ কোনো তথ্য নেই। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানার জন্য ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে আশাহত হবেন অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত কোনো গবেষণা জার্নাল। বিভিন্ন বিভাগ থেকে গবেষণা জার্নাল প্রকাশিত হলেও নেওয়া হয় না শিক্ষার্থীদের কোনো লেখা। এভাবে চলতে থাকলে গবেষণায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয় সাধন হবে না, বরং দূরত্ব সৃষ্টি হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ইবি আবাসিক উল্লেখ থাকলেও ৪৪ বছরে তা পূর্ণতা পায়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আটটি হল, যাতে মাত্র ৪ হাজার শিক্ষার্থী থাকতে পারেন। পরিবহন পুলে ৪৫টি পরিবহন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি এসি কোস্টার গাড়িসহ বাস-মিনিবাস ২২টি, অ্যাম্বুলেন্স দুইটি, পিক-আপ দুইটি। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চাহিদার তুলনায় এই আবাসন ও পরিবহন সুবিধা অপ্রতুল। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন বিভাগ খোলা হলেও শ্রেণিকক্ষের বন্দোবস্ত হয়নি পূর্ণরূপে। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব ও সেমিনার লাইব্রেরির সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে নতুন বিভাগগুলো। যেখানে সব বিশ্ববিদ্যালয়গু সেশনজটের ব্যাধি থেকে বেরিয়ে এসেছে, সেখানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে রয়ে গেছে সেশনজট নামক অভিশাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সহযোগিতাপরায়ণ নয়, তাই দিনে দিনে বৈরিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে মানসম্মত থিসিস প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় বার্তা প্রকাশ ও অনুষদ-বিভাগীয় জার্নালগুলোতে শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। 

উল্লেখ্য, ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে ২২ নভেম্বর খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলায় ১৭৫ একর জমির ওপরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) স্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৮৬ সালে ২৮ জুন একাডেমিক কার্যক্রমের সূচনা করে। বর্তমানে আটটি অনুষদের অধীনে ৩৬টি বিভাগ রয়েছে। শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। ব্রিটিশ শাসনাধীন সময়ে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ঢাকাতে একটি মুসলিম তথা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ১৯২০ সালে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী চট্টগ্রামের পটিয়ায় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফান্ড গঠন করেন। ১৯৩৫ সালে মাওলানা শওকত আলী মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৪৯ সালে মওলানা মোহাম্মাদ আকরম খাঁ কমিটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু বহু কমিশন গঠন ও বহু প্রস্তাবের পরেও যখন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি, তখন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৪ সালে সন্তোষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারিভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। যাহোক, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে একটি গবেষণা-প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেট ও ভিসি ভবনসহ প্রায় ভবনগুলোই মুসলিম স্থাপত্যে নির্মিত। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন রয়েছে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তর মসজিদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ইতিহাস ও তার সূচনা হয়েছিল বহু স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। যেই লক্ষ্য নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বীজ বোনা হয়েছিল, তা আজ লুপ্ত, সেই মহান লক্ষ্যের সিকিতুল্যও বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ার লক্ষ্যে সব সমস্যা সমাধান করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজ গর্বে দাঁড়িয়ে থাকবে। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন