বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈশ্বিক খাদ্যসংকটে বাংলাদেশের করণীয়

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০০:০১

জীবনে বেঁচে থাকার জন্য ও শক্তির প্রধান উৎস হলো খাদ্য। যেসব আহার্যসামগ্রী গ্রহণ করলে দেহের বৃদ্ধি, পুষ্টি, শক্তি সঞ্চয়, শক্তি উৎপাদন, ক্ষয় পূরণ হয় ও রোগপ্রতিরোধ করে তা গ্রহণ করা মানবজীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তাই নিয়মমাফিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ জরুরি। শুধু ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমরা খাবার গ্রহণ করি এমনটা নয়; এর পাশাপাশি আমাদের দেহের যাবতীয় কার্যকলাপ সম্পাদনের জন্য আমাদের প্রতিদিন খাবার গ্রহণ করতে হয়। শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে খাবার গ্রহণের পর তা পাকস্থলীতে পরিপাক হয়ে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে গিয়ে আমাদের শক্তি প্রদান করে। ফলে আমাদের দেহের ভেতরে ও বাইরে কাজ করার জন্য শক্তি পাই। এর পাশাপাশি সঠিক পরিমাণে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার শরীরের ডিফেন্স মেকানিজম হিসেবে বিভিন্ন রোগের জীবাণু শনাক্ত করে এবং তা ধ্বংস করে। তাই পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারই পারে প্রাথমিকভাবে শরীরের বিভিন্ন ধরনের রোগ মুক্ত করতে। সুতরাং সুস্থ জীবনযাপনের জন্য খাদ্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু দিনদিন যেভাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে তা অকল্পনীয়। খাদ্যের পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রীর দামও অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছে। প্রতিটি পণ্যের দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত মাসে প্রকাশিত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, খাদ্যের উচ্চমূল্য এ দেশের ৮৮ শতাংশ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা ও বাধা। প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ উচ্চমূল্যের কারণে তাদের মৌলিক খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত করা জরিপ বলছে যে, ৬৮ শতাংশ  পরিবার পারিবারিক খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ঋণ নিয়েছে এবং ২৯ শতাংশ মানুষ তাদের সঞ্চয় ভাঙতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এর পর থেকে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ নিচেই অবস্থান করছিল। গত মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ যা ৯ বছরে সর্বোচ্চ বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যম থেকে উঠে এসেছে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দ্রব্যমূলের যে দাম ছিল, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একই পণ্যের দাম ৫০-৯০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের অভাব ইত্যাদিকে দায়ী করা হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ মানুষ দরিদ্র হতে পারে—এমনটা আশঙ্কা করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দামের সঙ্গে বাড়ছে শস্য উৎপাদন খরচও। দেশ দুইটি থেকে রপ্তানি বন্ধ থাকায় মজুত পণ্যের ওপরও পড়ছে প্রভাব। এতে ভেঙে পড়েছে পুরো সাপ্লাই চেইন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কারণ প্রতিটি পণ্যের দাম এমন হারে বেড়েছে যা মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে  দুই-এক বছর আগে যে পণ্যটি ৩০০-৪০০ টাকায় পাওয়া যেত এখন তা কিনতে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি  অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটা চাল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৩০ টাকা, সেই চাল ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৪৫ টাকা হয় এবং অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ টাকায়। প্রতি কেজি চালের মূল্যবৃদ্ধি ৫৩ শতাংশ! খোলা আটা ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছিল ২৮ টাকা, একই আটা ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৩৪ টাকা হয় এবং অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ টাকা। প্রতি কেজি আটার মূল্যবৃদ্ধি ৯৬ শতাংশ! তেল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৮৬ টাকা ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ১৩৮ টাকা হয় এবং অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬২ টাকায়। প্রতি কেজি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ৮৮ শতাংশ! ডালকে গরিবের আমিষ বলা হয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ডাল অতীব গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যা খাবারে প্রতিদিন অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেই ডাল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৫৫ টাকা, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৯০ টাকা হয় এবং অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ টাকা। প্রতি কেজি ডালের মূল্যবৃদ্ধি ৭৩ শতাংশ! এবং প্রতিনিয়ত এই দাম বেড়েই চলেছে; কিন্তু প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়লেও সেই হারে সবার আয় বৃদ্ধি পায়নি। ফলে মানুষ তার দৈনিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে দিনমজুরদের অবস্থা করুণ। এক জন কৃষকের তার উৎপাদিত ফসলের মূল্যের চেয়ে খরচ বেশি হওয়ায় তা দূরে সরে আসছে। এক জন দিনমজুর প্রতিদিন কাজ করেও তার সংসার চালাতে পারছে না। মাছচাষিরা মাছের খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন লোন বা সঞ্চিত অর্থের মাধ্যমে তা পরিশোধ করছেন। একজন সাধারণ চাকরিজীবী বাধ্য হচ্ছেন দুই-এক বেলা না খেয়ে থাকতে। বিপরীতভাবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় বিভিন্ন পণ্য ও খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখছেন। দ্রব্যমূল্য ছাড়াও রিজার্ভ-সংকট তীব্র হচ্ছে। নজিরবিহীন রিজার্ভ-সংকট আইএনও থেকে ঋণপ্রত্যাশা বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিরূপ ভূমিকা রাখছে। উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল ক্রয়ের প্রভাবে প্রতিটি পর্যায়ের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সার ও কীটনাশকের সংকট ভোক্তাপর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব বৃদ্ধি করাসহ খাদ্যনিরাপত্তা শৃঙ্খলকে ব্যাহত করছে।

আপাতদৃষ্টিতে এ ঘনীভূত সংকট থেকে উত্তরণ অনেকটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অনিশ্চিত বাঁক বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশসমূহের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধিকে ঘোর অমানিশার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। চলমান সংকট মোকাবিলায় দেশীয়ভাবে খাদ্যের জোগান নিশ্চিতে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। কৃষকদের ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে এনে খাদ্য বাজারের মূল্যের লাগাম টানা যেতে পারে। সর্বোপরি সবাইকে মিতব্যয়ী হয়ে চলমান ও আসন্ন সংকট নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন